গবাদি পশুর টিকা সংকটে কুমিল্লার খামারিরা

কুমিল্লায় গবাদি পশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ও খুরারোগ। গত দুই মাসে এসব রোগে প্রায় এক লাখ গরু আক্রান্ত হয়েছে বলে দাবি কৃষকদের। তাদের মতে, আক্রান্ত গরুর মধ্যে ১০ হাজারের বেশি মারা গেছে, যার বেশির ভাগই বাছুর। টিকার তীব্র সংকটের কারণে খামারিরা দিশেহারা।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায়, জেলার ১৭টি উপজেলায় ৪ হাজার ৫৮৭টি ছোট-বড় গরুর খামারে প্রায় ১২ লাখ গরু রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত টিকার অভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। কর্মকর্তারা বলছেন, আগের তুলনায় এবার টিকার বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। নিয়মিত টিকাদান চললেও লাম্পি স্কিন ডিজিজের ভ্যাকসিন সংকট তীব্র।

নাঙ্গলকোট, লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, লালমাই, চৌদ্দগ্রাম, বরুড়া, চান্দিনা, হোমনা ও বুড়িচং উপজেলায় এ রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। গত দুই মাসে এসব এলাকায় ১০ হাজারের বেশি গরু মারা গেছে। নাঙ্গলকোটের রায়কোট গ্রামে মজিবুল হক, আব্দুল খালেক, রেজু হাজারী, ইয়াছিন মোল্লাসহ অনেকের গরু খুরারোগে মারা গেছে। চান্দগড়া গ্রামে ছালে আহম্মেদ মেম্বারের ছয়টি, গোমকোট গ্রামে আব্দুল মান্নানের চারটি ও পেরিয়া গ্রামে মাহবুবুর রহমানের দুটি গরুর মৃত্যু হয়েছে।

লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত গরুতে প্রথমে জ্বর, খাবারে অনীহা, নাক-মুখ দিয়ে লালা, পা ফোলা ও শরীরে পি-াকৃতির ক্ষত দেখা দেয়। ক্ষত থেকে রক্তপাত, পুঁজ নিঃসরণ ও শরীর ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। মুখের ভেতরের ক্ষতের কারণে পানি ও খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।

খুরারোগে গরুর শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে, মুখে ও পায়ে ক্ষত, ফেনাযুক্ত লালা এবং খোঁড়া ভাব দেখা দেয়। গর্ভবতী গাভীর গর্ভপাত ও দুধালো গাভীর দুধ উৎপাদন কমে যায়। ৬ মাসের কম বয়সি বাছুরের মৃত্যুহার প্রায় ৯৫ শতাংশ।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, বেশিরভাগ খামার রেজিস্ট্রেশনের বাইরে, এবং প্রায় সব কৃষকের বাড়িতে গরু রয়েছে, যার সিংহভাগই খুরারোগে আক্রান্ত।

নাঙ্গলকোটের গোমকোটের আব্দুল মান্নান জানান, তিনি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কেনা গাভী ও বাছুরের খুরারোগের চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়েছেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল থেকে ১,৫০০ টাকার ওষুধ প্রয়োগেও কোনো ফল পাননি। তবে হোমিওপ্যাথি ও বনজ ওষুধে কিছুটা উপকার পেয়েছেন।

বক্সগঞ্জের গ-াপুর গ্রামের খামারি সাইফুল ইসলাম পাটোয়ারী অভিযোগ করেন, তার ৩০০ গরুর আধুনিক খামারে নিয়মিত টিকা দেওয়া হলেও এবার কোনো টিকা পাননি। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল আল মামুন সাগর বলেন, ‘খুরারোগের তুলনায় লাম্পি স্কিন ডিজিজ বেশি দেখা যাচ্ছে। বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ২০টি গরুর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে ভ্যাকসিন সংকট রয়েছে।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, ‘প্রতিটি রোগের জন্য নিয়মিত খামার পরিদর্শন করা হচ্ছে। খুরারোগ কিছুটা বেড়েছে, তবে টিকার স্বল্পতার মধ্যেও আমরা চেষ্টা করছি। অনেক গরু সুস্থ হয়েছে।’

টিকা সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে কুমিল্লার গবাদি পশু খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন খামারিরা।