শিক্ষক আন্দোলন

আলোচনাতেও সমাধান নেই চলবে কর্মসূচি

মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতার দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার পঞ্চম দিনের মতো আন্দোলন করেছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণার পর গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার ও শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীনের সঙ্গে আলোচনায় বসে ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। আলোচনায় বসেও কোনো সমাধান হয়নি জানিয়ে শিক্ষকরা বলছেন তাদের আন্দোলন ও কর্মবিরতি চলবে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব প্রিন্সিপাল মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, শিক্ষকদের দাবি আদায়ে বারবার আশ^স্ত করে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও কোনো দাবি মানা হয়নি। আজও (গতকাল) শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার ও শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীনের সঙ্গে এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রত্যাশী জোটের আলোচনা হয়েছে। আমাদের দাবিগুলো পুনর্বিবেচনা করবেন বলে জানান এবং আন্দোলন ও কর্মবিরতি প্রত্যাহার করার কথা বলেন। কিন্তু দাবি আদায়ের প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হলে উপদেষ্টারা চলে যান। আমরাও চলে আসি। তাই শিক্ষকরা ন্যায্য দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।

সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, অর্থ উপদেষ্টা বিদেশ থেকে দেশে ফিরলে আগামী অর্থবছর থেকে শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ভাতা ১০ শতাংশ বৃদ্ধির জন্য আহ্বান জানাবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এ সময় শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীন বলেন, ‘আগামী ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ৫ শতাংশ বা সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রস্তাবনা গ্রহণ করে আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী বেতন স্কেলে শিক্ষকদের দাবির বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।

বৈঠক শেষে এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব প্রিন্সিপাল মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, গত ১২ অক্টোবর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও শহীদ মিনারের সামনে আমরা দাবি আদায়ে টানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে টানা ২২ দিন এমপিওভুক্তির জন্য আন্দোলন করেছি। তখন শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেন, আমাদের উৎসবভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা বর্তমান বাজেট থেকে দেওয়া হবে। সেই আশ্বাসে আমরা আন্দোলন স্থগিত করে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাই। তখন আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম, আমাদের ভাতা কার্যকর না হলে আমরা আবার আন্দোলনে আসব।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছিলেন আমাদের অন্যান্য ভাতা বাড়ানো হবে এবং বাজেটে বরাদ্দ রাখা হবে। এরপর আমরা একটা আল্টিমেটাম দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেই আগস্টে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৩ আগস্টের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে আমরা আন্দোলনে যাব। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের ভাতা ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ ও বাড়িভাড়া ৫ শতাংশসহ অন্যান্য কিছু সুবিধা দিয়ে একটা চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাল। সেই চিঠি আমাদের কাছে আসে। তারপর আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৩ আগস্ট থেকে আন্দোলনে আসলাম। তখন শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে আমরা সভা করে বাড়িবাড়া ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করলে তিনি তাতে রাজি হলেন। তারপর আমরা সেখান থেকে চলে যাই।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘আজকে আমাদের এখানে ডাকা হয়েছে সমস্যা সমাধানের জন্য। আমরাও চাই সমস্যা সমাধান করে আমরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাব। কিন্তু আজকে আসার পর তারা আগের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরতে রাজি না। তারা আলোচনার নামে আই ওয়াশ করেছেন। তারপর আমরা আজকে আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছি সেখানে আমরা বর্তমান বাজেট থেকে ১০ শতাংশ বাড়িভাড়া এবং আগামী বাজেট থেকে ১০ শতাংশ বাড়িভাড়া দেবেন। সেই বিষয়টা উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপন করতে হবে। সেটা পুনর্বিবেচনার জন্য বলেছিলাম। সেটা তারা করেননি। তারপর আমরা বলেছি আমাদের পক্ষে এই সমস্যা কোনোভাবে ম্যানেজ করা সম্ভব না। আমরা এটা পারব না। এরপর উপদেষ্টা উঠে চলে গেছেন এবং আমরাও চলে এসেছি।’

শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিবের প্রস্তাবনা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। ৭ লাখ কোটি টাকার বাজেটে হাজার কোটি টাকায় অস্ত্র কিনতে পারে, বিভিন্ন প্রকল্পের নামে তছরুপ হচ্ছে। কিন্তু সরকার শিক্ষকদের ৩ হাজার টাকা দিতে পারছে না। এই রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যাক, আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

শিক্ষকদের এই নেতা বলেন, ‘আমরা কোনো অবস্থাতেই আমাদের শ্রেণি কার্যক্রমে ফিরব না। আমরা বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করব না। শান্তিপূর্ণভাবে অনশন করতে করতে এখানে মরে যাব। আমাদের শহীদ মিনারে ফায়ার করে মেরে ফেলেন, তবুও আমরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত যাব না। যেতে হলে আমাদের লাশ যাবে।’

দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘যে রাষ্ট্র ৬ লাখের বেশি শিক্ষকদের ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে পারে না। সেই রাষ্ট্রের উচিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে ছুটি দিয়ে দেওয়া। আমরা সিএনজি, রিক্সা চালিয়ে, কৃষিকাজ অথবা দিনমজুরের কাজ করে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করব।

এর আগে যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি ঘিরে গতকাল দুপুর ১টার পর থেকেই কয়েক হাজার শিক্ষক-কর্মচারী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন। তারা খ- খ-ভাবে একসঙ্গে সেøাগান দেন। তাদের কণ্ঠে শোনা যায়  ‘২০ শতাংশ বাড়িভাড়া, দিতে হবে দিতে হবে’, ‘বাংলার শিক্ষক, এক হও এক হও’, ‘শিক্ষকদের সঙ্গে প্রহসন, মানি না মানি না’সহ নানা সেøাগান।

উল্লেখ্য, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা এবং এমপিওভুক্ত কর্মচারীদের উৎসবভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার দাবি তুলেছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের ব্যানারে গত রবিবার (১২ অক্টোবার) থেকে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।