পাকিস্তানে উজানে এবার বাঁধ দিচ্ছে আফগানিস্তান

তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান পাকিস্তানে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কুনার নদীতে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এই সিদ্ধান্তটি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার পানি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ পানি ও শক্তি মন্ত্রণালয়ের মতে, সর্বোচ্চ নেতা মাওলানা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিজে এই বাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন।

অভ্যন্তরীণ পানি ও শক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোল্লা আব্দুল লতিফ মানসুর বলেছেন, ‘আফগানদের নিজস্ব পানি নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। এটি আমাদের জন্য জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কৃষি উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।’

তিনি আরও বলেন, কোনো বিদেশি কোম্পানির জন্য অপেক্ষা না করে দেশীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে কাজ শুরু করতে হবে। এই ঘোষণা গত দুই সপ্তাহ ধরে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তেব্যাপক সহিংসতার মধ্যে এসেছে। ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে পাকিস্তানি সেনা এবং তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) গোষ্ঠীর লড়াই অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিককালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, এই বাঁধ পরিকল্পনা ডুরান্ড রেখায় উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।

পাকিস্তানের সরকারি সূত্র জানিয়েছে, তারা নদীর গতি পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে, কিন্তু আফগানিস্তানের এই পদক্ষেপকে ‘শত্রুতাপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছে।

কুনার নদী, যা পাকিস্তানে চিত্রাল নদী নামে পরিচিত, হিন্দুকুশ পর্বতমালার চিত্রাল অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ৪৮০-৫০০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়। এটি আফগানিস্তানের কুনার ও নানগারহার প্রদেশ অতিক্রম করে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় প্রবেশ করে, জালালাবাদের কাছে কাবুল নদীতে মিলিত হয় এবং অবশেষে পাঞ্জাবের অ্যাটকের কাছে সিন্ধু নদীতে যোগ দেয়।

এই নদী পাকিস্তানের সেচ ব্যবস্থা, পানীয় জল এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়ার জনগণের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। যদি প্রবাহ কমে

যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদন ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং পানির অভাবে মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাঁধ আফগানিস্তানের জন্য ১০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, যা দেশের শক্তি স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়াবে।

এই ঘটনা চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চার দিনের যুদ্ধের পর ভারতের সিন্ধু নদী চুক্তি স্থগিতের সঙ্গে সংযুক্ত। পাহালগামে ২৬ নাগরিক হত্যার ঘটনায় পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসীদের দায় চাপিয়ে ভারত চুক্তি বাতিল করে পানি প্রবাহ বন্ধের হুমকি দিয়েছে। এখন আফগানিস্তানের এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের পানি নিরাপত্তাকে দ্বিগুণ চাপে ফেলেছে।

এদিকে ভারত আফগানিস্তানের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়িয়েছে, যেমন সালমা ড্যাম এবং শাহতুত ড্যাম, যা কাবুলের ২০ লাখ মানুষের পানি সরবরাহ করবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ‘পানি যুদ্ধ’-এর আশঙ্কা জাগিয়েছে।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক পানি বণ্টন চুক্তি না থাকায়, ইসলামাবাদের হাত বাঁধা। পাকিস্তানের প্রাক্তন কর্মকর্তা জান আচাকজাই বলেছেন, এটি ‘শত্রুতাপূর্ণ কাজ’।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ না হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। আফগানিস্তানের এই উদ্যোগ তার পানি সম্পদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে, কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।