হাইড্রোজেন প্রযুক্তির সূত্র দিলেন শাহাবুদ্দিন

বিশ্ব জুড়ে নবায়নযোগ্য ও সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রচেষ্টায় এবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে হাইড্রোজেন জ্বালানি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কার্বন নির্গমন কমাতে বিকল্প শক্তি খোঁজার যে দৌড় শুরু হয়েছে, সেখানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইড্রোজেনই হতে পারে আগামী শতাব্দীর জ্বালানি বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু। আর এই হাইড্রোজেন জ্বালানি প্রযুক্তির পরিপক্বতা নির্ণয়ের সূত্র আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. শাহাবুদ্দিন।

টানা দুই বছর চেষ্টা করে শাহাবুদ্দিনের যুগান্তকারী ওই সূত্র দিয়ে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত হাইড্রোজেন প্রযুক্তির ম্যাচিউরিটি লেভেল বা পরিপক্বতার মাত্রা পরিমাপ করা যাবে। পাশাপাশি একটি দেশের অন্য যেকোনো প্রযুক্তির পরিপক্বতা পরিমাপও করা যাবে এই সূত্র দিয়ে।

কী সেই সূত্র তা জানতে চাইলে ড. শাহাবুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৭০-এর দশকে আমেরিকার নাসা ‘প্রযুক্তির পরিপক্বতার মাত্রা’ বা টিআরএল আবিষ্কার করেছিল, যেটা ছিল তাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তিতে। কিন্তু এই টিআরএল দিয়ে একটি দেশের হাইড্রোজেন প্রযুক্তির পরিপক্বতা পরিমাপ করা সম্ভব নয় এবং নির্দিষ্ট গাণিতিক সংখ্যাও বের করা যায় না। মূলত এটিই আমি দেখিয়েছি।’

‘এজন্য আমি গাণিতিক কাঠামোর ভিত্তিতে একটি সূত্র আবিষ্কার করেছি, যা দিয়ে নির্দিষ্ট গাণিতিক মান বের করা সম্ভব। এর নাম দিয়েছি ‘হাইড্রোজেন রেডিনেস লেভেল বা এইচআরএল ইনডেক্স (হাইড্রোজেন প্রযুক্তির পরিপক্বতার সূচক)। এই সূচক দিয়ে একটি দেশের হাইড্রোজেন অথবা অন্য যেকোনো প্রযুক্তির পরিপক্বতার মান করা যাবে। ফলে প্রযুক্তির পরিপক্বতার ফাঁক, বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খল, নীতি নির্ধারণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রাধিকার বিবেচনায় নজর দেওয়া সম্ভব হবে।

হাইড্রোজেন প্রযুক্তির পরিপক্বতার সূত্র হলো একটি বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি, যা দিয়ে বোঝা যায় কোনো হাইড্রোজেন প্রকল্প গবেষণার স্তরে আছে নাকি বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সূচকটি ব্যবহার হয় নীতি নির্ধারণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নির্ধারণ, বাজেট, বিনিয়োগ, ও গবেষণা পরিকল্পনায়। এক কথায় এটি পরিপক্বতার আয়না, যা দেখায় কতদূর এগিয়েছে ভবিষ্যতের সবুজ জ্বালানির পথ।

শাহাবুদ্দিনের সূত্রটি প্রকাশিত হয়েছে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষস্থানীয় জার্নাল ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হাইড্রোজেন এনার্জিতে। যার শিরোনাম ‘নেট জিরো বা শূন্য কার্বন নির্গমন অর্জনের পথে হাইড্রোজেন প্রযুক্তিতে জাতীয় প্রস্তুতি মূল্যায়নের জন্য একটি নতুন সূচক’।

ফরিদপুর জেলায় জন্ম নেওয়া বিজ্ঞানী শাহাবুদ্দিন গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিবিদ্যালয়ে (ডুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিকেশন অ্যাওয়ার্ডসহ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিট অব অ্যাডিলেড থেকে এম ফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি।

এই বিজ্ঞানী বর্তমানে মালয়েশিয়াতে বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব মালায়াতে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক এবং বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিবিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অস্ট্রেলিয়া, ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অব অস্ট্রেলিয়া, ইউএনএসডব্লিউ সিডনি এবং ইউটিএস সিডনির মতো স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন ড. শাহাবুদ্দিন।

তিনি বিগত চার বছর যাবৎ স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং এলসেভিয়ারে প্রকাশিত তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকাতে রয়েছেন।

ড. শাহাবুদ্দিন আশা করছেন তার উদ্ভাবিত এইচআরএল সূচক বিশ্বব্যাপী টেকসই জ্বালানি গবেষণা বিশেষ করে হাইড্রোজেন অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

হাইড্রোজেন জ্বালানির যুগ : আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের মোট হাইড্রোজেন উৎপাদনের প্রায় ৯৫ শতাংশই আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। তবে দ্রুত বাড়ছে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের উদ্যোগ, যা সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানির ইলেকট্রোলাইসিসের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি যদি বৃহৎ পরিসরে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি স্টিল, সিমেন্ট, সার ও পরিবহন খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ গিগাওয়াট ক্ষমতার ইলেকট্রোলাইজার স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ‘ক্লিন হাইড্রোজেন স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করেছে, যেখানে ২০৩৫ সালের মধ্যে হাইড্রোজেনভিত্তিক শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ইতিমধ্যে হাইড্রোজেনচালিত গাড়ি ও জ্বালানি কোষ প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। চীন ইলেকট্রোলাইজার উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এবং বিপুল পরিমাণ প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে। ভারত ২০২৩ সালে শুরু করেছে জাতীয় গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বাজারের অন্যতম সরবরাহকারী হওয়া।

হাইড্রোজেন জ্বালানি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, ভারী পরিবহন, জাহাজ, রেল ও বিমান চলাচল ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সীমাবদ্ধতা যেখানে বেশি, সেখানে হাইড্রোজেন হতে পারে কার্যকর বিকল্প। একই সঙ্গে, স্টিল ও কেমিক্যাল শিল্পে সবুজ হাইড্রোজেন ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যে নামানো সম্ভব বলে মনে করছেন গবেষকরা।

বাংলাদেশে হাইড্রোজেন প্রযুক্তি গবেষণাও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকারও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রেখেছে। হাইড্রোজেন উৎপাদন, সঞ্চয় ও জ্বালানি কোষ প্রযুক্তি নিয়ে দেশে খুবই সীমিত পরিসরে গবেষণার কাজ শুরু হলেও এখনো তেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি।