পুরনো কোনো জিনিসকে নতুন জীবন দেওয়ার মধ্যে এক গভীর আনন্দ লুকিয়ে আছে। জীর্ণ, ধুলোমাখা সেসব জিনিস, যা ব্যস্ত জীবনের আড়ালে আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। তাই যখন ইন্টারনেট দুনিয়া নবুও ওকানোর গল্পের সন্ধান পেল, তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল। নবুও ওকানো হলেন একজন জাপানি কারিগর, যিনি পুরনো, জীর্ণ বই সারিয়ে সেগুলো প্রায় নতুনের মতো করে তোলেন। নবুও ওকানো একদিনে তারকা হননি। বই সারানোর এই শিল্প আয়ত্ত করতে তিনি ৩০ বছর সময় দিয়েছেন। তিন দশক ধরে তিনি কালির দাগ, ছিঁড়ে যাওয়া মলাট, কুঁকড়ে যাওয়া কোনা আর পুরনো অভিধানের ভেতরে থাকা ভঙ্গুর সূচিপত্রগুলো সযতেœ বাঁচিয়ে রেখেছেন। যখন কেউ কোনো কাজ এত দীর্ঘ সময় ধরে করেন, তখন তিনি বইকে আর শুধু বস্তু হিসেবে দেখেন না, বরং সেটিকে গল্প ও শিল্পের এক বাস্তব রূপ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
তার এই যাত্রার শুরু হয়েছিল একটি বিশেষ কঠিন কাজ দিয়ে : একটি ১,০০০ পৃষ্ঠার ইংরেজি-জাপানি অভিধান। বইটির মালিক বহু বছর আগে এটি ব্যবহার করতেন। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা হাতবদল হয় এবং বহু বছর পর স্মৃতির টানে আবার খুঁজে বের করা হয়। অবশেষে, বইটি সারানোর জন্য ওকানোর কাছে নিয়ে আসা হয়। ওকানো এমন সব বই সারান, যার মলাটের আঠা নষ্ট হয়ে গেছে, পাতার কিনারা ক্ষয়ে গেছে এবং মলাটের রঙ এতটাই ফিকে হয়ে গেছে যে, বইয়ের নাম পর্যন্ত মুছে গেছে। কিছু বই দেখলে মনে হয়, তারা যেন ইতিমধ্যেই কয়েকটি জীবন পার করে এসেছে। ওকানোর কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও যতœশীল এবং এটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং নিখুঁত। আর এ ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ওকানো বইয়ের মূল কাঠামোকে কোনো ক্ষতি না করে অত্যন্ত সাবধানে নষ্ট হয়ে যাওয়া আঠা চেঁচে ফেলেন। কাজটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই বইয়ের পাতাগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ওকানোর কাছে যখন এসব বই আসে, তখন সেগুলো কুঁচকে থাকে। তিনি শুধু সেগুলো সোজা করেন না, বরং নতুন কাগজের ওপর আঠা দিয়ে জুড়ে দেন, যাতে দুর্বল জায়গাগুলো আরও ছিঁড়ে না যায়। কখনো কখনো তিনি মেনে নেন যে রঙ হুবহু মিলবে না। কারণ সারানোর অর্থ সবসময় নতুনের মতো করে তোলা নয়, বরং তাকে স্থিতিশীল এবং সুন্দর করে তোলা।
পাতার কোনা সোজা করতে তিনি চিমটা ব্যবহার করেন। চিমটার সাহায্যে প্রতিটি পাতার কোনা খোলা হয়, সামান্য ভেজানো হয় এবং তারপর একটি ছোট্ট ইস্ত্রি দিয়ে সোজা করা হয়। এটি একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া। অনেক বইয়ের পাতার কিনারায় দাগ, বিবর্ণতা বা অসমতা থাকে। এটি ঠিক করার জন্য ওকানো একটি শক্তিশালী পেপার কাটার ব্যবহার করে কিনারাগুলো সমানভাবে কাটেন এবং কখনো কখনো হালকা রঙ লাগিয়ে দেন বা শুধু পরিষ্কার করেন। বইয়ের সামনের ও পেছনের মলাট প্রায়ই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওকানো যা কিছু বাঁচানো সম্ভব, তা সংরক্ষণ করেন : বইয়ের নাম, মূল অক্ষর এবং নকশার অংশ। যদি সেগুলো খুব বেশি নষ্ট হয়ে যায়, তবে মূল রূপ এবং অনুভূতি বজায় রেখে একটি নতুন মজবুত মলাট তৈরি করাও তার কাজের অংশ।
ওকানোর কাজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ওকানোর কাজ আমাদের ঐতিহ্য ও স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরতে সাহায্য করে। একটি বই শুধু লেখা বহন করে না, এটি ইতিহাসও বহন করে। প্রতিটি পাতা মনে করিয়ে দেয় কে এটি ধরেছিল, কে পড়েছিল, এটি কোথায় কোথায় ঘুরেছে এবং এর মার্জিনে কী দাগ রয়েছে। বই সারানো মানে শুধু শব্দকে সম্মান করা নয়, বরং সেই জীবনগুলোকেও সম্মান জানানো, যা এই বইয়ের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুরনো বই সংরক্ষণ ও নবায়ন করার মাধ্যমে এটিও প্রমাণিত হয় যে জীর্ণতার মধ্যেও এক ধরনের মর্যাদা রয়েছে। সবকিছুই পুরনো হয়, পাতা হলুদ হয়ে যায়, আঠা নষ্ট হয় এবং বাঁধন আলগা হয়ে যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বইটির মূল্য কমে গেছে। এটি ছাপানোর দিনের মতোই এখনো সমান দরকারি এবং গুরুত্বপূর্ণ।