আজাদের দাফন, দুই সন্তান নিয়ে অথই সাগরে স্ত্রী

‘আমার দুই সন্তান তাদের বাবাকে ছাড়া এক রাতও ঘুমায়নি। প্রতি রাতে বাবা বাড়ি ফিরে তাদের জড়িয়ে ধরলে তবেই তারা ঘুমাত। কিন্তু রবিবার রাতে বাবাকে না পেয়ে তারা সারা রাত ছটফট করেছে। তারা এখনো ছোট, কিছু বোঝে না, শুধু বাবাকে খোঁজে। এখন আমার সন্তানরা কাকে নিয়ে ঘুমাবে? আমার মানিক (স্বামী) আমাদের একা রেখে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেছে।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই বলছিলেন আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী আইরিন আক্তার প্রিয়া। রাজধানীর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে প্রাণ হারান আজাদ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার রাত ১টার দিকে আজাদের মরদেহ শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামে নিয়ে আসা হয়। গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় মোক্তারের চর পূর্ব পোড়াগাছা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে নড়িয়া বাজার জামে মসজিদের গণকবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

দাফনের পর প্রিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিন। তাদের গাফিলতির কারণেই তো আমার স্বামীর মৃত্যু হলো। মেট্রোরেলের পিলারে বিয়ারিং প্যাড ঠিকমতো স্থাপন করা হলে এই দুর্ঘটনা ঘটত না। আমার অবুঝ সন্তানরা বাবাহারা আর আমি স্বামীহারা হতাম না।’

তিনি বলেন, ‘আজাদ প্রতিদিন সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে বের হতেন, তাদের পছন্দের খাবার আর খেলনা কিনে দিতেন। এখন আমার সন্তানদের কে দেখবে? আমি দুই সন্তান নিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।’

তিনি দাবি করেন, ‘এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। যাদের উদাসীনতায় আমার স্বামীর মৃত্যু হলো, তাদের কঠোর বিচার চাই।’

আজাদের মৃত্যুতে তার পরিবার দিশেহারা। দুই শিশুসন্তান নিয়ে স্ত্রী প্রিয়া যেন পাগলপ্রায়। অন্যদিকে, নয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট আজাদকে হারিয়ে পরিবারের শোকের সীমা নেই। স্বজন ও এলাকাবাসী মেট্রোরেল কর্র্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও দায়ীদের বিচার দাবি করেছেন।

আবুল কালাম আজাদ শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঈশ্বরকাঠি গ্রামের জলিল চোকদার ও হনুফা বেগমের সন্তান। ছয় বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। কিশোর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে ভাইবোনদের কাছে বড় হন। ২০১২ সালে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে মালয়েশিয়ায় যান। ফিরে এসে ২০১৮ সালে পাশের গ্রামের আইরিন আক্তার প্রিয়াকে বিয়ে করেন। তাদের চার বছরের ছেলে আব্দুল্লাহ ও আড়াই বছরের মেয়ে আরিশা। পরিবার নিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকায় থাকতেন এবং মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন।

আজাদের বাল্যবন্ধু রিহানুজ্জামান বলেন, ‘আগের রাতে আজাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। বলেছিল, ভালো আছি। সেই মানুষটা আজ নেই। এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।’

তার চাচাতো ভাই আব্দুল গনি মিয়া বলেন, ‘এত আধুনিক প্রকল্পে এমন নিরাপত্তা বিপর্যয় কীভাবে হয়? দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।’

শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. ইমরুল হাসান বলেন, ‘আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন তার পরিবারের পাশে আছে। পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’