জুলাই সনদ

বিএনপির সই করা পাতা বদলানো হয়েছে : রিজভী

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ স্বাক্ষরিত হয়েছে। যখন স্বাক্ষর করেছে সব রাজনৈতিক দল। ঐকমত্য কমিশনে যারা দায়িত্বে আছেন তারা যখন স্বাক্ষরিত সেই কাগজটি চূড়ান্তভাবে জমা দিলেন, তখন দেখা গেল বিএনপি যেটাতে স্বাক্ষর করেছে সেই পাতা নেই। অন্যপাতা যুক্ত হয়েছে। এটা দুঃখজনক কথা। ড. ইউনূস সাহেবকে সবাই সম্মান করেন। তার গঠন করা বিভিন্ন কমিশনের দ্বারা এমন প্রতারণামূলক কাজ হবে তা মানুষ বিশ্বাস করে না।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামে জন্মান্ধ আব্দুল গফুর মল্লিককে তার নিজ বাড়িতে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তিনি।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দেশ এক ভিন্ন রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হচ্ছে। একটি পরিস্থিতি গেছে সেটা হলো ফ্যাসিবাদী আমল, গুম খুনের আমল, বিরোধী দলের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার আমল। বিরোধী দল যাতে জোড়ালোভাবে কথা বলতে না পারে সেই আমল। মানুষ ফিসফিস করে কথা বলেছে। একটা গ্রামে একটা এলাকায় কত রাজনৈতিক দল থাকতে পারে। একটি রাজনৈতিক দলের ভয়ে কেউ জোরে কোনো কথা বলতে পারেনি। একটি বিপদসংকুল ভয়াবহ ভয় আর আতঙ্কের পরিবেশ ছিল সেই আমল। সেটি শেখ হাসিনার আমল। সেটি আওয়ামী লীগের আমল। সেটি ১৪ দলীয় জোটের আমল। সেখানে কারও কোনো কথা বলার অধিকার ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘গত ১৬ বছর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এক আপসহীন সংগ্রাম করা হয়েছে। সেটি ছিল মানুষের বাকস্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, মুক্তকণ্ঠে কথা বলার স্বাধীনতা, মিছিল করার স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতা, যেটি সংবিধানে আছে। সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আমরা লড়াই করেছি। বিএনপির চেয়ারপারসনকে যখন বন্দি করা হলো। তার উন্নত চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া হলো। সেই মুহূর্তে দলের হাল ধরলেন তারেক রহমান। তারেক রহমান গোটা জাতীকে ভার্চুয়ালি ঐক্যবদ্ধ করে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে বেগবান করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমলের চাইতে হয়তো এখন কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করছি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে স্বাধীনতা ভোগ করার বিষয়টি হচ্ছে আগামী নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হবে কি না, কোনো কারিগরি হবে কি না, কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং হবে কি না, এই কথাগুলো তো আসছে। আজকে জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ স্বাক্ষরিত হলো। যখন স্বাক্ষর করেছে সব রাজনৈতিক দল। ঐকমত্য কমিশনে যারা দায়িত্বে আছেন তারা যখন স্বাক্ষরিত সেই কাগজটি চূড়ান্তভাবে জমা দিলেন, তখন দেখা গেলে বিএনপি যেটাতে স্বাক্ষর করেছে সেই পাতা নেই। অন্য পাতা যুক্ত হয়েছে। এটা দুঃখজনক কথা। ড. ইউনূস সাহেবকে সবাই সম্মান করেন। তিনি  একজন গুণীজন। তার নেতেৃত্বে এই সরকার। তাকে তো বিএনপিসহ আন্দোলনকারী সব রাজনৈতিক দল সমর্থন দিয়েছিল। তার গঠন করা বিভিন্ন কমিশনের মাঝখান থেকে এই ধরনের প্রতারণামূলক কাজ হচ্ছে এটা খুবই দুঃখজনক কথা।’

তিনি বলেন, ‘এখন সংবিধানে এককক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট চালু আছে। এখন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে অথবা বাতিল করতে হবে। যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে তো সংবিধান বাতিল করতে হবে। তাহলে সংবিধান নতুন করে করবেন। স্বাধীনতার পর যে সংবিধান রচিত হয়, জনগণ ও সমাজের তাগিদ অনুযায়ী সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী সেটি সংশোধিত হয়ে যায়। এটি সব গণতান্ত্রিক দেশের নিয়ম। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান সংশোধন হতে পারে। কিন্তু জুলাই সনদের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে ২৭০ দিনের মধ্যে যদি পার্লামেন্ট পাস না করে তাহলে তা অটো পাস ধরে নেওয়া হবে। একদলীয়, একতান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী কোনো দেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এটা সম্ভব না।’

সত্যিকার গণতন্ত্রের জন্য আবু সাঈদ, ওয়াসীম, মুগ্ধরা জীবন দিল। তার ঐকমত্য কমিশন জনগণের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা হয় কী করে। আমরা নিরাশাবাদী নই, আমরা হতাশাবাদী নই। আমরা আশা রাখতে চাই। স্বাধীনতার পর থেকে যেভাবে সংবিধান সংশোধন হয়েছে সেভাবে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু করে, বাকশাল করে, সব দল তারা নিষেধ করেছে। সংবাদপত্র নিষেধ করেছে। জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় আসেন তখন তিনি সংবিধান সংশোধন করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। সংবিধানের মধ্যে আল্লাহর নাম ছিল না। জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-এর মাধ্যমে আল্লাহর নাম আনেন।

সংবিধানে হয়তো অনেক কিছু সংশোধন হতে পারে। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক  দেশে সংবিধান সংশোধিত হতে হতে জনগণের স্বার্থকে যেভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় সেভাবে সংশোধিত হয়তো হতেই পারে। তার জন্য সংবিধান বাতিলের প্রয়োজন নেই। সংবিধানের মধ্যে যে গণতান্ত্রিক শূন্যতা বা ঘাটতি আছে সেটি একটি সনদ করে পার্লামেন্টের মাধ্যমে সংবিধানে সংযোজিত হতে পারে। আমরা যদি সেভাবে না চলি তাহলে একটি সুগঠিত রাষ্ট্র গড়তে পারব না।

রিজভী বলেন, আব্দুল গফুর মল্লিক চোখে দেখেন না। কিন্তু তিনি কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ বিষয়টি তারেক রহমানের দৃষ্টিতে আসে। তিনিই তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার সহযোগিতা আমরা দিতে এসেছি। তাকে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর পক্ষ থেকে সহযোগিতা করতে এসেছি। এ সময় আব্দুল গফুর মল্লিকের হাতে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা তুলে দেন রুহুল কবির রিজভী।

এ সময় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, সদস্য সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন, রাজবাড়ী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আইনজীবী লিয়াকত আলী, যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. আসলাম মিয়া, সদস্য সচিব কামরুল আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএ খালেদ পাভেলসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।