মহান আল্লাহর কাছে পরোপকার অত্যন্ত পছন্দনীয় কাজ। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি মানুষের বেশি উপকার করে, সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ।’ (আল মুজামুল আওসাত)। মানুষের উপকার করা যায় বিভিন্নভাবে। অর্থ দিয়ে, শক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে এবং বিদ্যা দিয়ে। কিন্তু কারও প্রতি কোনো প্রকার অনুগ্রহ করে অথবা তাকে কোনো কিছু দান করে অতঃপর তা উল্লেখপূর্বক খোঁটা দেওয়া মারাত্মক কবিরা গুনাহ। এমন দান বা অনুগ্রহের কোনো সওয়াব মিলবে না।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা নিজেদের দান-সদকাকে খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে বিনষ্ট কোরো না সে ব্যক্তির মতো, যে নিজ ধনসম্পদ ব্যয় করে মানুষকে দেখানোর জন্য, উপরন্তু সে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী নয়। সুতরাং তার দৃষ্টান্ত এমন এক মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর কিছু মাটি জমেছে, অতঃপর ভারী বর্ষণ হয়ে সেই মাটি সরে গিয়ে শুষ্ক মসৃণ হয়ে গেল। তারা যা অর্জন করেছে, তা আর কিছুই পেল না। মূলত আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে সঠিক পথ দেখান না।’ (সুরা বাকারা ২৬৪)
খোঁটা দেওয়া যে কত গর্হিত কাজ, তা আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তিন ব্যক্তি এমন, কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ যাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাদের পরিশুদ্ধ করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আবু জর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) এ কথা তিনবার বললেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! তারা কারা, তারা তো সর্বস্বান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি পরিধেয় কাপড় টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে রাখে, যে ব্যক্তি উপকার করার পর খোঁটা দেয় এবং যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে।’ (সহিহ মুসলিম)
মহান আল্লাহ একেকজনকে একেকরকম যোগ্যতা দিয়েছেন। যার যেই যোগ্যতা আছে, সে যদি তার সেই যোগ্যতাকে সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত করে, তবেই তার সেই যোগ্যতা সার্থক হয়। পরোপকার যে পন্থায়ই করা হোক, মহান আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার শর্ত হলো তাতে ইখলাস থাকা। অর্থাৎ, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কাজটি করা। কোরআনে এসেছে, ‘আমরা তো তোমাদের খাওয়াই শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও না।’ (সুরা দাহর ৯)
দান করে খোঁটা না দেওয়ায় আছে বিশেষ সুফল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে, অতঃপর ব্যয় করার পর খোঁটা দেয় না বা কষ্ট দেয় না, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে আছে পুরস্কার। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তান্বিত হবে না।’ (সুরা বাকারা ২৬২)। এ ছাড়া মুসলিম ভাইয়ের সহযোগিতা করলে মহান আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (আবু দাউদ)
মানুষের উপকার করা যেমন মহান কাজ, তেমনি সেই উপকারের মর্যাদা নষ্ট না করা আরও বড় দায়িত্ব। দান, সহায়তা বা অনুগ্রহ তখনই মূল্যবান হয়, যখন তা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং তাতে আত্মপ্রদর্শন বা খোঁটার ছায়াও থাকে না। অনুগ্রহের পর খোঁটা দেওয়া শুধু সেই সওয়াব নষ্টই করে না, বরং মানুষকে অপমানিত করে এবং সমাজে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। তাই প্রকৃত মুমিন সেই, যে দান করে নিঃস্বার্থভাবে, সাহায্য করে বিনিময়ের আশা ছাড়াই। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে পরোপকার করার তওফিক দিন এবং অনুগ্রহের পর খোঁটা দেওয়ার মতো গর্হিত কাজ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার