ওজন কমানোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে ডায়েট। এর ফলে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানো সম্ভব। ডায়েট পরিকল্পনা, খাবারের ধরন এবং সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে ওজন কমানোর উপায়গুলো জানালেন পুষ্টিবিদ দিলরুবা আফেরোজ
কেন বাড়ে ওজন
ওজন বাড়ার বড় কারণ হলো অস্বাস্থ্যকর আর অপরিমিত খাবার-দাবার, আয়েশী জীবনযাপন এবং শারীরিক পরিশ্রম না করা। যারা নিয়মিত ব্যায়াম বা ডায়েট করেও ওজন কমাতে পারছেন না তাদের এই ওজন বাড়ার পেছনে বড় কারণ ওবিসোজিনস। ওবিসোজিনস হলো এমন কেমিক্যাল, যা আপনার পরিপাকতন্ত্রে আঘাত হানে এবং অনেক সময় সেক্স হরমোনের ওপরও প্রভাব ফেলে। কারও শরীরে ওবিসোজিনস বেশি পরিমাণে থাকলে শরীরে চর্বি জমার জন্য যে কোষগুলো দায়ী সেই কোষের সংখ্যা ও আকার বাড়িয়ে দেয়। আবার যেসব ব্যাকটেরিয়া চর্বি শোষণ করে, তার পরিমাণ কমায়। এতে চামড়ার নিচে চর্বির আবরণের ঘনত্ব বাড়তে থাকে। টাইপ টু ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং এই দুটির প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা হার্টের সমস্যা, স্লিপ অ্যাপনিয়া এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও দেখা দেয়। সে সঙ্গে লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গে গ্লুকোজ ও ফ্যাটি অ্যাসিড জমে। ফলে হরমোনের কার্যকলাপেও পরিবর্তন আসে, হজমেও সমস্যা দেখা দেয়। তবে এই কেমিক্যাল সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে যদি কেউ মাতৃগর্ভে বা ছোটবেলায় এই কেমিক্যালের সংস্পর্শে আসেন। তখন সেটা ‘ডিএনএ’র গঠনকে পরিবর্তন করে। এর ফলে জিনের বৈশিষ্ট্য, কোষের কার্যকলাপ বদলে যায়। ওবিসোজিনসের কারণে মানুষের হজম শক্তি, প্রজনন ও বৃদ্ধি এই তিনটিই বেশি প্রভাবিত হয়।
ডায়েট পরিকল্পনা
১. ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ ২. উচ্চ প্রোটিনের খাবার ৩. কম কার্বোহাইড্রেট খাবার ৪. ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার
৫. স্বাস্থ্যকর ফ্যাট।
খাবারের পরিকল্পনা : সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার, বিকালের স্ন্যাকস ও রাতের খাবার।
ওজন কমাতে চাইলে খাবার নির্বাচন এবং খাবারের পরিমাণে ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অনেকেই ধারণা করেন খাবার কম খেলেই ওজন কমে। কিন্তু স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমাতে সঠিক পুষ্টির ওপর মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ : ওজন কমানোর জন্য ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ মূল বিষয়। প্রতিদিনের ক্যালরি গ্রহণ কমাতে হবে, যাতে শরীরে সঞ্চিত ফ্যাট থেকে শক্তি নিতে বাধ্য হয়।
উচ্চ প্রোটিনের খাবার : প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার ক্ষুধা কমায় এবং পেশি টোন বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য যেমন ডিম, মুরগির মাংস, মাছ, দই, মটরশুঁটি ও বাদাম খাদ্য তালিকায় রাখা যায়।
কম কার্বোহাইড্রেট খাবার : ওজন কমাতে সাদা ভাত, চিনি, ময়দা জাতীয় উচ্চ কার্বোহাইড্রেট খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। এর পরিবর্তে, বাদামি ভাত, ওটস, কোয়ার্ক এবং শাকসবজি গ্রহণ করা যেতে পারে।
ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার : ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার শরীরের বিপাক ক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে এবং হজমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, যবের ছাতু, চিয়াসিড এবং সম্পূর্ণ শস্যের মতো আঁশযুক্ত খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে, ফলে ক্ষুধা কমায়। এ ধরনের খাবার শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট বার্নে সহায়ক এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট : স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বা স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যা শরীরকে শক্তি প্রদান করে এবং বিভিন্ন ভিটামিন শোষণে ভূমিকা রাখে। অলিভ অয়েল, নারিকেল তেল, বাদামের তেল এবং অ্যাভোকাডোর মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে।
খাবারের পরিকল্পনা : ওজন কমানোর জন্য প্রতিদিনের খাবার একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে সাজানো যেতে পারে।
সকালের নাশতা : ওজন কমানোর জন্য সকালের নাশতায় অবশ্যই হালকা খাবার গ্রহণ করবেন। যেমন : একটি সেদ্ধ ডিম, একটি ফল। তাহলে সকালের খাবার পরিপূর্ণ হবে এবং সঠিক পুষ্টিগুণও নিশ্চিত করা যাবে।
দুপুরের খাবার : দুপুরের খাবার একটু ভারী হয় এবং এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। দুপুরের খাবারে বেশি মনোযোগী ও সতর্ক হওয়া উচিত। যেমন :লাল চালের ভাত, সবজি, মুরগি বা মাছ, সালাদ। ওজন কমানোর ডায়েট চার্টে দুপুরের খাবার তালিকায় এই খাবারগুলো রাখা উচিত।
বিকেলের স্ন্যাকস : বিকেলে হালকা পরিমাণে স্ন্যাকস খাওয়া যেতে পারে। যেমন : বাদাম, চিয়া সিড, পুডিং, গ্রিন টি।
রাতের খাবার : সন্ধ্যা রাতেএকটু ভারী খাওয়া প্রয়োজন। পুষ্টিওস্বাস্থ্যকর খাবার অবশ্যই রাখতে হবে। ব্রাউন রাইস বা মিষ্টি আলু, ভেজিটেবল স্যুপ, সালাদ।
টিপস : আপনার ডায়েটের জন্য যা মেনে চলবেন। যেমন-
পানি পান : প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, কারণ এটি বিপাক ক্রিয়াকে উন্নত করে।
ব্যায়াম : নিয়মিত ব্যায়াম ওজন কমাতে সহায়ক।
ঘুম : পর্যাপ্ত ঘুম ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
বাইরের প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার : বাইরের প্রক্রিয়াজাত খাবারে উচ্চমাত্রার ফ্যাট ও চিনির উপস্থিতি থাকে। যা ওজন বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। ডায়েট এর জন্য এই টিপসগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এতে করে আপনি আরও সহজে ডায়েট করতে পারবেন।
ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা : আপনার ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা তৈরি করতে, একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ প্রত্যেকের শরীরের প্রয়োজন ভিন্ন এবং ডায়েট সেটআপ। সেই অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ডায়েট হবে।