থার্ড টার্মিনাল চালুর চাপে বেবিচক

নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের কার্যক্রম। নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে হলেও জটিলতা পিছু ছাড়ছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা পাওনার বিষয়টিও সুরাহা হচ্ছে না। সার্বিক বিষয় নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এর মধ্যে দ্রুত উদ্বোধন করতে চাচ্ছে কর্র্তৃপক্ষ। সর্বশেষ সপ্তাহ দুয়েক আগে শাহজালালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাসহ অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকেও টার্মিনাল উদ্বোধন করতে বলা হয়েছে। তাছাড়া, মন্ত্রণালয়ও উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করতে বেবিচককে চাপ দিচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

তবে বেবিচক জানিয়ে দিয়েছে, চলতি বছর টার্মিনাল চালু প্রায় অসম্ভব। এখনো অনেক কাজ বাকি আছে। ‘স্বপ্নের থার্ড টার্মিনাল’ নির্মাণকাজ প্রায় ৯৯ ভাগ শেষ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে টার্মিনালটি চালু করার চাপ এবং অন্যদিকে জাপানি অপারেটর কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনার চুক্তি ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় বেবিচক পড়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এ পরিস্থিতিতে টার্মিনালটি সম্পূর্ণরূপে চালু করতে আরও তিন থেকে চার মাস লাগতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে সংস্থাটি।

বেবিচকসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ‘সফট ওপেনিং’ হওয়ার পর ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এটিকে পুরোদমে যাত্রীসেবার জন্য উন্মুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু নানা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক জটিলতার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য জাপানের একাধিক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। তবে কনসোর্টিয়াম বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। উচ্চহারে ল্যান্ডিং চার্জ, যাত্রী সুরক্ষা ফি ও বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি থেকে আয়ের অংশীদারত্ব এবং বাণিজ্যিক স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেবিচকের অস্বস্তি তৈরি হয়। শর্তগুলো অবাস্তব মনে হওয়ায় চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া এখনো আটকে আছে। তাছাড়া, টার্মিনাল ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কিছু উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে। এমনকি কিছু যন্ত্রপাতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে আর্থিক ক্ষতিরও কারণ হচ্ছে। দ্রুত চালু করা না গেলে এ ক্ষতি আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অত্যাধুনিক এ টার্মিনাল পরিচালনার জন্য প্রায় ছয় হাজার প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন, যার মধ্যে চার হাজারজন থাকবে নিরাপত্তার দায়িত্বে। এত বিশালসংখ্যক কর্মীর নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রে স্থাপন করার কাজটিও সময়সাপেক্ষ। নির্মাণকাজ শেষে কোরিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্যামসাং বেবিচকের কাছে অতিরিক্ত কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করেছে। এই পাওনা পরিশোধের বিষয়টি নিয়েও জটিলতা চলছে, যা টার্মিনাল হস্তান্তরেও কিছুটা প্রভাব ফেলছে। ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, ইমিগ্রেশন, বোর্ডিং ব্রিজ, ভিজিডিএস আন্তর্জাতিকমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও নিবিড় এবং ব্যাপক পরিসরে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব প্রযুক্তিগত, লজিস্টিক এবং চুক্তিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্যই তাদের অন্তত তিন থেকে চার মাসের মতো অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। কিন্তু ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনাল উদ্বোধন করতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এর আগে প্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা দিয়ে সমালোচনার মধ্যে পড়তে হয়েছে। বাধ্য হয়ে ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে। থার্ড টার্মিনালের ক্ষেত্রে আমরা তা করতে চাচ্ছি না।’

সূত্র জানায়, শাহজালালে অনুষ্ঠিত হওয়া বৈঠকে থার্ড টার্মিনালের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তির অচলাবস্থা নিরসন করার ওপর জোর দেওয়া হয়। যদি বিদেশি অপারেটর পাওয়া না যায়, সে ক্ষেত্রে বেবিচকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটি পরিচালনা করার সম্ভাব্যতা যাচাই করা এবং সে অনুযায়ী জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হয়। টার্মিনাল পুরোপুরি চালু করার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অপারেশনাল প্রস্তুতিতে কী ধরনের ঘাটতি আছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত তা পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ও বিআরটির সঙ্গে সংযোগ থাকায় যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমবে।

বেবিচক সূত্র আরও জানায়, ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। নির্মাণকাজে অর্থায়ন করছে জাইকা। ভবনটির নকশা করেছেন বিখ্যাত স্থপতি রোহানি বাহারিন। তিনি এনওসিডি-জেভি জয়েন্টভেঞ্চার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সিপিজি করপোরেশন প্রাইভেট লিমিটেডের (সিঙ্গাপুর) স্থপতি।

জাপানের শীর্ষ নির্মাতা কোম্পানি সিমুজি ও কোরিয়ার সেরা স্যামসাং নামের দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) নামের প্রতিষ্ঠানটিই বর্তমানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। দুই দেশের চার শতাধিক দক্ষ জনবল সক্রিয় কাজে। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। টার্মিনালে থাকবে কেবিন এক্সরে মেশিন ৪০টি, বোর্ডিং ব্রিজ ১২টি, কনভেয়ার বেল্ট ১৬টি, বডি স্ক্যানার ১১টি, টানেলসহ বহুতলবিশিষ্ট কার পার্কিং ৫৪ হাজার বর্গমিটার, নতুন ইমপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স এবং নতুন এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স ৬৩ হাজার বর্গমিটার, রেসকিউ ও ফায়ার ফাইটিং স্টেশন এবং ইকুইপমেন্ট ৪ হাজার বর্গমিটার, ভূমি উন্নয়ন, কানেক্টিং টেক্সিওয়ে (উত্তর) ২৪ হাজার বর্গমিটার, কানেক্টিং টেক্সিওয়ে (অন্যান্য) ৪২ হাজার ৫০০ বর্গমিটার, র‌্যাপিড এক্সিট টেক্সিওয়ে (উত্তর) ২২ হাজার বর্গমিটার, র‌্যাপিড এক্সিট টেক্সিওয়ে (দক্ষিণ) ১৯ হাজার ৫০০ বর্গমিটার, শোল্ডার ৯৬ হাজার ৫০০ বর্গমিটার, জিএসই রোড ৮৩ হাজার ৮০০ বর্গমিটার, সার্ভিস রোড ৩৩ হাজার বর্গমিটার, ড্রেনেজ ওয়ার্কস (বক্স কালভার্ট ও প্রোটেকটিভ ওয়ার্কস), বাউন্ডারি ওয়াল, সিকিউরিটি গেট, গার্ডরুম ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ, ল্যান্ড সাইড, সার্ভিস রোডসহ এলিভেটেড রোড, ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেম, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ইনটেক পাওয়ার প্ল্যান্ট ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম, কার্গো কমপ্লেক্সের জন্য সিকিউরিটি ও টার্মিনাল ইকুইপমেন্ট, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম, হাইড্রেন্ট ফুয়েল সিস্টেম থাকছে। টার্মিনালের অন্যতম আকর্ষণ ফানেল টানেল। ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার অ্যাপ্রোন ও ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি রাখার সুবিধা, ৬৩ হাজার বর্গফুট জায়গায় আমদানি-রপ্তানি কার্গো কমপ্লেক্স, ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার সব মিলিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দরের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল।

নাম প্রকাশ না করে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন আরেক কর্মকর্তা গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থার্ড টার্মিনালকে সামনে রেখে ১২টি নতুন এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আবেদন করেছে। খুবই সুন্দরভাবে সাজানো হচ্ছে পুরো টার্মিনাল। সিলিংয়ে সোনালি, সাদা, আকাশি রঙের চোখ-ধাঁধানো কারুকাজ। মেঝেতে লাগানো হচ্ছে বাহারি টাইলস। বাইরে দেওয়া হয়েছে শাপলা ফুল। টার্মিনালের জন্য বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৫ হাজার ২৫৮ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। বাকি ১৬ হাজার ১৪১ কোটি ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জাইকা। এরই মধ্যে টাকা ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। পরে ওই অর্থের জোগান দিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।

তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ার পর ঢাকা বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা দ্বিগুণ হবে। এতে বার্ষিক যাত্রী হ্যান্ডলিং ক্ষমতা হবে ২৪ মিলিয়ন (পুরনো টার্মিনালসহ), যা এখন আট মিলিয়ন এবং বিমানবন্দরটি প্রতি বছর পাঁচ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডেল করতে পারে। নতুন টার্মিনালটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ভূগর্ভস্থ রেলপথ (এমআরটি-৫, কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর অংশ) ও একটি ভূগর্ভস্থ টানেলের মাধ্যমে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া আশকোনা হজ ক্যাম্প থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের মাধ্যমে যাত্রীরা তৃতীয় টার্মিনালে যেতে পারবেন।