গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় গণপিটুনিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার ভোর ৪টার দিকে উপজেলার কাঁটাবাড়ি ইউনিয়নের নাসিরাবাদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে নাসিরাবাদের পার্শ্ববর্তী হেলালী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ বলছে, নিহতরা চোর চক্রের সক্রিয় সদস্য। গত রাতে গরু চুরি করতে গিয়ে মারপিটে তাদের মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মাঝিহট্ট ইউনিয়নের দামপাড়া গ্রামের আলেব্বর আলীর ছেলে কাওছার আলী। তার মামা মোহাজার আলী জানান, দীর্ঘদিন থেকে কাওছার ঢাকায় রিকশা চালাতেন। মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে আসতেন। তবে গত ছয় মাসের মধ্যে তিনি বাড়িতে আসেননি। তার পাঁচ বছরের একটি মেয়েসন্তান আছে। তার দাবি, কাওছার অতীতে চুরি বা ডাকাতির কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল না। বাকিদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করছে রংপুর রেঞ্জের সিআইডির ক্রাইম সিনের একটি ইউনিট।
এ ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানার কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) তৌফিজ উদ্দিন বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মামলায় কাউকে আটক করা যায়নি। এসআই তৌফিজ উদ্দিন আরও বলেন, মরদেহ তিনটি ময়নাতদন্তের জন্য গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিনে হেলালী পাড়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় কৃষক আব্দুস সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রাত ৩টার দিকে গোয়ালঘরে কয়েল জ¦ালাতে গিয়ে দেখি আমার তিনটি গুরু নেই। পরে দেখি পাকা ঘোয়ালঘরের দেয়াল ভাঙা। এরপর আমি চোর চোর বলে চিৎকার করি। পরে আশপাশের লোকজন এসে চোরদের ধাওয়া করে। একপর্যায়ে বাড়ির পাশে ধানের জমির ভেতরে গরু তিনটি পাওয়া যায়। এ সময় চারদিক থেকে লোকজন জড়ো হয়। সবাই লাইট জ¦ালিয়ে আলোকিত করে। পরে আমার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নাসিরাবাদ এলাকায় শত শত লোক তিনজন চোরকে ধরে মারপিট করে। সেখানে দুজন মারা গেছেন বলে আমি শুনেছি এবং সকালে হাসপাতালে একজন মারা গেছেন সেটাও শুনেছি।
হেলালী গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী আল-আমিন (২১) বলেন, রাতে চিৎকার শুনে টর্চলাইট নিয়ে ঘটনাস্থলে আসি। পরে আমরা নাসিরাবাদ এলাকায় গিয়ে গিয়ে তিনজন লোক পুকুরে নেমে আছে দেখতে পাই। সেখানে শত শত লোকজন পুকুরের পার থেকে তাদের ইটপাটকেল মারছে। এরপর সেই তিনজন লোক পুকুর থেকে উঠে এলে শত শত লোকজন গণপিটুনি দিয়েছে। সেখানেই দুজন লোক মারা গেছেন। পরে শুনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা গেছেন।
যমুনাপাড়া গ্রামের প্রতক্ষদর্শী আসাদুল ইসলাম বলেন, নাসিরাবাদে আমার মনোহরি দোকান রয়েছে। রাতে চোর চোর বলে হইহুল্লোড় শুনে জেগে উঠি। পরে দোকান দেখতে যাওয়ার সময় একটি মিনি পিকআপ আমার সামনে আসে। তাদের আমি আটকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু তারা আমার ডান হাতে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে পিকআপ নিয়ে পালিয়ে যায়। তিন থেকে চারজন ছিল সেই গাড়িতে। তবে গরু চোর না ডাকাত সেটা বুঝতে পারিনি। ঘটনাস্থল থেকে আমার দোকান প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে।
হেলালী পাড়া গ্রামের আব্দুল করিম বলেন, রাতে গরু চোর চিৎকার শুনে সালামের বাড়িতে এসে দেখি তার গরু নেই। পরে সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করি। একপর্যায়ে গরু তিনটি পাওয়া যায়। এর আগেও এই গ্রামে কয়েকবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। গরু নিয়ে বিপদে আছি। রাত হলেই আতঙ্ক বাড়ে। গত সাত দিন আগেও বগুড়াপাড়া গ্রাম থেকে সাতটি গরু চুরি করে নিয়ে গেছে চোর। এ এলাকায় চোরের উপদ্রব খুব।
গাইবান্ধা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সি-সার্কলের) এবিএম রশিদুল বারী বলেন, ‘একটি চোরচক্র গত রাতে হেলালী পাড়ায় আব্দুস সালামের বাড়িতে গরু চুরি করতে গেলে এলাকার লোকজন তাদের গণপিটুনি দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে মৃত অবস্থায় পায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আর একজন মারা যায়। হত্যার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, গত শনিবার গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের দুর্গম তিস্তার চরে গরু চোর সন্দেহে আব্দুস সালাম (৫০) নামের এক প্রতিবন্ধীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি একই ইউনিয়নের রামডাকুয়া গ্রামের মো. ওয়ামেদ আলীর ছেলে। এ ঘটনায় নিহত প্রতিবন্ধী আব্দুস সালামের বাবা ওয়ামেদ আলী বাদী হয়ে সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল হাকিম আজাদ।