তালেবান পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পদ!

প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯৪ সালের শরৎকালে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর নির্দেশে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) প্রথমবারের মতো যোগাযোগ করে আফগানিস্তানের একটি ছোট্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবানের সঙ্গে। সে সময় সীমান্তের দুপাশের কেউ তখন কল্পনাও করেনি যে, এই অখ্যাত গোষ্ঠী মাত্র তিন বছরের মধ্যে আফগানিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চল দখল করে ফেলবে এবং পাকিস্তানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘কৌশলগত সম্পদে’ পরিণত হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষ, কথার যুদ্ধ এবং তালেবান শাসিত কাবুল সরকারের সঙ্গে ইসলামাবাদের একাধিক সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা এই উত্তেজনাকে একটি পুরনো সম্পর্কের অবসানের সূচনা হিসেবে দেখছেন।

বিবিসি উর্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশক ধরে আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানের দিকে তালেবানের ‘জনক’ হিসেবে আঙুল তোলা হচ্ছে। কিন্তু এই সম্পর্কের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? পাকিস্তান সরকার কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যার ফলে আইএসআই এবং তালেবানের মধ্যে প্রথম যোগাযোগ স্থাপিত হয়? তৎকালীন আইএসআই প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাভেদ আশরাফ কাজীর তালেবান সম্পর্কে ধারণা কী ছিল? বিবিসির একটি প্রতিবেদনে ঐতিহাসিক নথি, সাক্ষাৎকার এবং গোপন কূটনৈতিক চিঠির ভিত্তিতে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটি গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে। বিভিন্ন মুজাহিদীন গোষ্ঠী একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, প্রতিটি শহর ও অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই অরাজকতার মধ্যে ১৯৯৩ সালে ক্ষমতায় আসা বেনজির ভুট্টো দেখেন একটি সুযোগ। তিনি পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ায় একটি স্থলপথে বাণিজ্য করিডর গড়ে তুলতে চান। স্টিভ কোলের বিখ্যাত গ্রন্থ ঘোস্ট ওয়ার্স (২০০৪) বেনজিরের ২০০২ সালের সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ নিজ দেশের জন্য লাভজনক হবে বলে আমি মনে করতাম। পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ায় তুলা, জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস পণ্য পাঠানোর কথা বিবেচনা করছিলাম।’

বিবিসি বলছে, সে সময় বেনজির একটি উচ্চপর্যায়ের দল গঠন করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) নাসিরুল্লাহ খান বাবর। বাবর কাবুলের পরিবর্তে দক্ষিণাঞ্চলীয় পথকান্দাহার ও হেরাত হয়ে উল্লেখিত পথটির প্রস্তাব করেন। বেনজির এই বিকল্পটি গ্রহণ করেন। কোলের বইয়ে উল্লেখ আছে, ‘বেনজির ভেবেছিলেন, পশতুন অধ্যুষিত এলাকায় রাস্তাঘাট, টেলিফোন লাইন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করে স্থানীয় কমান্ডারদের অর্থ দিয়ে দক্ষিণ আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ায় পাকিস্তানের বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করা যাবে।’

এ বিষয়ে আইএসআইয়ের তখন কোনো আপত্তি ছিল না। মেজর (অব.) আগা হুমায়ুন আমিনের ‘পাকিস্তান আর্মি থ্রু দ্য আই অব পাকিস্তানি জেনারেলস’ গ্রন্থে বাবরের সাক্ষাৎকারে বলা হয়, উদ্দেশ্য ছিল ট্রাক ও ট্রেনে পণ্য পরিবহনের জন্য একটি নিরাপদ পথ। মধ্য এশিয়ার জ্বালানি সম্পদও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৯৪ সালের অক্টোবরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম বাণিজ্য বহর রওনা হয় কোয়েটা থেকে। টেক্সটাইল পণ্য নিয়ে কান্দাহার হয়ে তুর্কমেনিস্তান যাওয়ার কথা। কিন্তু হেরাত-কান্দাহার পথে স্থানীয় কমান্ডার বহরটি আটকে লুটপাট করে, চালকদের বন্দি করে। তৎকালীন আইএসআই প্রধান জেনারেল জাভেদ আশরাফ কাজী ২০২১ সালে একটি পাকিস্তানি টিভি চ্যানেলকে বলেন, ‘ট্রাকগুলো তুলা নিয়ে ফিরছিল। পাকিস্তানে তুলার ঘাটতি থাকায় সস্তায় সড়কপথে আমদানি করাই উদ্দেশ্য ছিল।’

খবর পেয়ে বাবর আইএসআইকে জানান, ওই এলাকায় তালেবান রয়েছে। তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কাজী বলেন, ‘আমরা তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা ব্যবস্থা নেয়। অপহরণকারীদের লোকজন পালিয়ে যায়। তুলাসহ ট্রাক ও বন্দিদের মুক্ত করে।’

এটাই ছিল পাকিস্তান ও তালেবানের প্রথম আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। যার বিনিময়ে তালেবানরা পায় শুধু কৃতজ্ঞতা।

ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসের ১৯৯৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির একটি গোপন চিঠি ঘটনাটি ভিন্নভাবে বর্ণনা করে। তালেবানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্রের বরাতে বলা হয়, ‘স্পিন বোলদাক এলাকায় বহর আটকে রাখার পর পাকিস্তান তাদের গুরুত্ব দিতে শুরু করে।’

বাবর কান্দাহার থেকে তালেবানকে না জানিয়ে অন্য কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে পাকিস্তানের অনুরোধে তালেবান পথের প্রতি কিলোমিটারে বসানো অবরোধ সরিয়ে দেয়কেউ বাধা দেয়নি।

তালেবানের জন্ম ১৯৯৪ গ্রীষ্মে কান্দাহারে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোপন নথি অনুসারে, মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে কয়েকশ’ যোদ্ধা মাইওয়ান্দ এলাকায় সক্রিয় হয়। আর্থিক

সহায়তা দেন স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজি বশির নূরজাই (পরে মার্কিন বিনিময়ে মুক্ত) এবং প্রথমদিকে হামিদ কারজাই (পরবর্তীতে আফগান প্রেসিডেন্ট)।

তালেবানের দ্বিতীয় দখল স্পিন বোলদাক, যেখানে তারা ১৭টি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে বিপুল অস্ত্র পায়। আহমেদ রশিদের ‘পাকিস্তান অ্যান্ড দ্য তালেবান’ বইয়ে দাবি করা হয়, সুড়ঙ্গে ১৮ হাজার কালাশনিকভ (একে-৪৭) ছিল। কাজী বলেন, ‘পাকিস্তান জানত সুড়ঙ্গগুলোতে রাশিয়ার অস্ত্র আছে, কিন্তু মোল্লা আব্দুল সালাম রকেতি সেগুলো তালেবানের হাতে তুলে দেন।’

মার্কিন নথি অবশ্য পাকিস্তানি সহায়তা অস্বীকার করে। নভেম্বর ১৯৯৪-এ তালেবান কান্দাহার দখল করে, বিমানবন্দরে ৬টি মিগ-২১ ও ৪টি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার পায়।

কোলের বইয়ে অবশ্য বলা আছে, তালেবান প্রতিনিধিদল (মোল্লা রব্বানীর নেতৃত্বে) মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে নিরপেক্ষতা চায়, খাবার-জ্বালানি চায়। কাজী বলেন, ‘তাদের অভিযানে পাকিস্তানের কোনো ভূমিকা ছিল না। আমরা পর্যবেক্ষণ করছিলাম।’

কিন্তু ১৯৯৪ ডিসেম্বরের মার্কিন চিঠিতে কাজী বলেন, ‘তালেবান বিপজ্জনক ও অনিয়ন্ত্রিত শক্তি হতে পারে।’ তিনি সরকারকে সমর্থন না করার পরামর্শ দেন।

বিষয়টি নিয়ে বেনজির কোলকে বলেন, ‘প্রথম বৈঠকের পর আইএসআই গোপনে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, অর্থ চায়। আমি অর্থ ছাড়তে শুরু করি, কিন্তু পরিমাণ জানি নাঅনেক ছিল।’

তবে বিষয়টি কাজী অস্বীকার করেন। ১৯৯৫ অক্টোবরে কাজীর মেয়াদ শেষে নাসিম রানা আসেন।

বেনজির ১৯৯৫ সালে ফিলিপাইনে বলেন, ‘আমরা আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করিনি, কোনো পছন্দ নেই।’

এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে লন্ডনে তালেবান সমর্থন অস্বীকার করেনঠিক তিনদিন পর তালেবান কাবুল দখল করে। তিনি বলেন, ‘অতীতে পশ্চিমা বিশ্ব পাকিস্তান দিয়ে অস্ত্র পাঠাত, কিন্তু এখন আমাদের অর্থনীতি তা সমর্থন করে না।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্ম পাকিস্তানের বাণিজ্যিক স্বপ্ন থেকে শুরু হয়ে তালেবানের উত্থান একটি কৌশলগত জোটে রূপ নেয়। প্রথম যোগাযোগ একটি দুর্ঘটনা থেকে, কিন্তু পরবর্তী সহায়তাজ্বালানি, অর্থ, প্রশিক্ষণতালেবানকে পাকিস্তানের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বানায়। আজকের সীমান্ত সংঘর্ষ এই সম্পর্কের ফাটল দেখায়, কিন্তু ইতিহাস বলে, তালেবানের বিকাশ পাকিস্তানের হাতেই ঘটেছে।