হামলার অভিযোগে ৪০৩ ছাত্রলীগ নেতাকে শোকজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত বেআইনি ও সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৪০৩ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযুক্তরা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত বেআইনি এবং সহিংস ঘটনার তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব সাইফুদ্দীন আহমদের সই করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

জড়িতদের ৭ দিনের মধ্যে লিখিত শোকজের জবাব দিতে হবে। জবাব না দিলে তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হতে পারে।

শোকজ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রথম পর্যায়ে গঠিত তথ্যানুসন্ধান কমিটি ১২৮ শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরবর্তী সময়ে গত ১৭ মার্চ সিন্ডিকেট সভায় তাদের সাময়িকভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ঘটনাটির অধিকতর তদন্তের জন্য সিন্ডিকেট ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির দ্বিতীয় সভায় অতিরিক্ত আরও শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, যার ফলে মোট অভিযুক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০৩ জন।

এতে বলা হয়, কৃত অপরাধের জন্য কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না তার কারণ দর্শিয়ে লিখিত জবাব ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রক্টর অফিসে জমা দিতে হবে। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক একতরফা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঢাবি প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ জানান, নতুন অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তালিকায় নাম যোগ হতে পারে এবং যারা  শোকজের জবাব দেবে না, তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ১৫ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান ছাত্র আন্দোলনের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দিনভর দফায় দফায় হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই আহত হন অন্তত ২৯৭ শিক্ষার্থী। যাদের ভর্তি করা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ছাড়া সারা দেশে ছাত্রলীগের হামলায় আহত হন অন্তত চার শতাধিক শিক্ষার্থী। সেসময় ছাত্রলীগের সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সন্ধ্যায় আহতদের চিকিৎসা চলাকালেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে হামলা চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, আবাসিক হল, এমনকি হাসপাতালও এদিন আন্দোলনকারীদের জন্য নিরাপদ ছিল না।

এর পেছনে ছিল আগের দিন ১৪ জুলাই বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তব্য। সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে? এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিন রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। স্লোগান ওঠে “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার”, “চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার”।’

এর পরদিন ১৫ জুলাই ধানমন্ডিতে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ আত্মস্বীকৃত রাজাকার, গত রাতে নিজেদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। এর জবাব ছাত্রলীগই দেবে।’ একই সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘রাজাকার বলে যারা স্লোগান দিয়েছে, তাদের শেষ দেখে ছাড়ব।’ এরপরই সারা দেশে শুরু হয় সংঘবদ্ধ হামলা। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তার অধিভুক্ত সাত কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। বিকেল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ হলপাড়ার দিকে মিছিল নিয়ে গেলে বিজয় একাত্তর হলের সামনে প্রথম সংঘর্ষের সূচনা হয়। মধুর ক্যান্টিন ও আশপাশের হল থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রড, হকিস্টিক, রামদাসহ অস্ত্র নিয়ে মল চত্বরে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়। ছত্রভঙ্গ হয়ে শিক্ষার্থীরা ভিসি চত্বর এলাকায় আশ্রয় নিলে সেখানেও তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে উঠলেও সেখানে ঢুকে হামলা চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, মহানগর ছাত্রলীগ ও সাত কলেজ শাখা ছাত্রলীগ এই হামলায় অংশ নেয়।

ক্যাম্পাসে সহিংসতার পাশাপাশি রাতে আবাসিক হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো হয় আরেক দফা নিপীড়ন। রাত ১০টার পর স্যার এ এফ রহমান হল, বিজয় একাত্তর হল, মাস্টারদা সূর্যসেন হল ও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা মোবাইল ফোন তল্লাশি শুরু করে। আন্দোলনে সম্পৃক্ততা পেলে শিক্ষার্থীদের মারধর করা হয়।