জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২২ ডিসেম্বর। গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সাজিদ একাডেমি ভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নিবার্চন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান।
তিনি বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী দিবস, শহীদ দিবস, শীতকালীন ছুটি সব বিবেচনা করে এ নির্বাচননের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা আশা করি, সব বিবেচনায় আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারব।’
নির্বাচন তফসিল অনুযায়ী, আচরণ বিধিমালা প্রকাশ ৫ নভেম্বর, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা ৫ নভেম্বর, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ ৬ নভেম্বর, ভোটার তালিকায় আপত্তি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি ৯ নভেম্বর থেকে ১১ নভেম্বর, জকসু নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বিতরণ ১৩,১৬ ও ১৭ নভেম্বর (সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা), জকসু নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল ১৭ ও ১৮ নভেম্বর (সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা), মনোনয়নপত্র বাছাই ১৯ এবং ২০ নভেম্বর।
এ ছাড়া, জকসু নির্বাচনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ২৩ নভেম্বর। প্রার্থীদের আপত্তি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি ২৪ থেকে ২৬ নভেম্বর (সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৩ টা), চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ৩ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ৪, ৭ এবং ৮ ডিসেম্বর। প্রত্যাহারকৃত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে ৯ ডিসেম্বর।
এদিকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্র শিবির, ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ) , ছাত্র অধিকার পরিষদ ও জাতীয় ছাত্র শক্তি (বাগছাস) একত্রে ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ মিছিল করে।
পক্ষপাতমূলক তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলনে শিবিরের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এর আগে ৭ অক্টোবর ২০২৫ নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে। তারা সব ধরনের কাজ করে রেখেছে। ২৭ নভেম্বর নির্বাচন করবে বলে প্রস্তুতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।। একটা সংগঠন নির্বাচন পেছানের জন্য জোরাজুরি করতে থাকে। একটি সংগঠনকে খুশি করার জন্য ২৬ দিন পিছিয়ে ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনে তারিখ ঠিক করা হয়। ডাকসু, রাকসু পেছানোর জন্য এই সংগঠন অনেক কিছু করেছে, হামলাও হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের থেকে এমন পক্ষপাতমূলক আচরণ আশা করি না। জবির সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে আমরা জকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।’
আপ বাংলাদেশের আহ্বায়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল ছাত্র সংগঠন নির্বাচন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ জকসু নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, আমাদের কয়েকটি দাবি হলো- ১. ঘোষিত তফসিল পুনর্বিবেচনা করতে হবে, ২. নির্বাচন কমিশনকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ৩. প্রশাসনকে স্বচ্ছ নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান থেকে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি এ কে এম রাকিব বলেন, ‘আজকে যে তফসিলের ঘোষণা হয়েছে এটি সম্পূর্ণ একটি পক্ষকে খুশি করা হয়েছে। উদ্ধেগ প্রকাশ করছি এক তরফাভাবে এই তারিখ ঘোষণার কারণে। এইভাবে সময় অতিবাহিত করার ফলে নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এই তারিখ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এখানে স্পষ্টতই নির্বাচন কমিশন এর অদূরদর্শিতা প্রকাশ পেয়েছে এবং এরা কি আদতেই নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে কি না এ বিষয়ে আমরা সন্দিহান। এই তারিখ পালটে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি আমরা।’
ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান থেকে জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদ বলেন, ‘এখানে সবাই যেটা ভাবছে সেটার উল্টোটা হয়েছে, ছাত্রদলকে ছাত্রশিবির ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে দিয়েছে। অবিবেচকের মতো কমিশন নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে ২২ ডিসেম্বর নিয়েছে। ছাত্রশিবিরকে সুবিধা দিতেই নির্বাচন পেছানো হয়েছে। অন্যদিকে বাকি ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রহসনমূলক আচরণ করেছে এই প্রশাসন। নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্টত বলে দিতে চাই তারা যেন নির্বাচন ডিসেম্বরের প্রথম ১০ দিনের মধ্যেই আয়োজন করে।’
বিক্ষোভ মিছিলে ‘প্রশাসনের প্রহসন মানি না, মানব না।’ ‘নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণ চলবে না’।
জগন্নাথ কলেজ ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫’ এ ছাত্র সংসদের অধ্যাদেশটি যুক্ত হয়নি। ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রোডম্যাপ প্রকাশ করে ৯৯তম সিন্ডিকেট মিটিংয়ে জকসু নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়া অনুমোন দেয়। পরে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে ছাত্র সংসদের নীতিমালা পাস হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৪ সালে প্রথম জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদ (জকসু) এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ভিপি এআর ইউসুফ আর জিএস সালাউদ্দিন আহমেদ নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের ১০টি কমিটি হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৭ সালে আরও চারটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়।
এরপর ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার আগপর্যন্ত ১৮ বছর ধরে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। আর জগন্নাথ কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার সময়ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ এ ছাত্র সংসদের কোনো আইন হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পরে প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদ অধ্যাদেশ যুক্ত ও নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।