নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) সমগ্র সৃষ্টিজগতের মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছিলেন। তার আগমনে অন্ধকারে নিমজ্জিত দুনিয়া পেয়েছিল সত্যের দিশা, মানবতা পেয়েছিল পূর্ণতা। মহান আল্লাহ তাকে সবদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তাকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। কোরআন ও হাদিসে তার সেই অনন্য মর্যাদা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল। সৃষ্টি জগতেও তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের সর্দার হবো। আমিই সবার আগে কবর থেকে উত্থিত হবো। সবার আগে আমিই সুপারিশ করব এবং সর্বপ্রথম আমার সুপারিশই কবুল করা হবে। (সহিহ মুসলিম ৫৮৩৪)
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, আমাকে এমন পাঁচটি বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে অন্য কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। প্রত্যেক নবীকে শুধু তার কওমের জন্য পাঠানো হতো। কিন্তু আমাকে সবার জন্য নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছে। আমার জন্য গণিমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হালাল করা হয়েছে। কিন্তু আমার পূর্বে আর কারও জন্য তা হালাল ছিল না। আমার জন্য গোটা পৃথিবী পাক-পবিত্র ও মসজিদ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং নামাজের সময় হলে যেকোনো লোক যেকোনো স্থানে নামাজ আদায় করে নিতে পারে। (সহিহ মুসলিম ১০৫০)
আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আমি আদম সন্তানদের সর্দার হবো। এতে অহংকার নেই। মহান আল্লাহর প্রশংসার পতাকা আমার হাতেই থাকবে, এতেও গর্ব নেই। সেদিন আদম (আ.) থেকে শুরু করে সব নবী ও রাসুল আমার পতাকার নিচে থাকবেন। (তিরমিজি ৩৬১৫)
কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজা তিনিই খুলবেন। অন্যান্য নবীরাও রাসুল (সা.)-এর পেছনে থাকবেন। তিনি সুপারিশের অধিকার লাভ করবেন। জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর তার জন্যই বরাদ্দ। কেয়ামতের দিন তিনি নবীদের ইমাম ও ভাষ্যকার হবেন।
তিনি যেভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী তেমনিভাবে সর্বোচ্চ চরিত্রেরও অধিকারী ছিলেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম ৪)
তিনি পৃথিবীবাসীর জন্য রহমত স্বরূপ। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘(হে নবী!) আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া ১০৭)
তিনি সর্বশেষ নবী। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘(হে মুমিনগণ!) মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন, তিনি আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবী। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞাত। (সুরা আহজাব ৪০)
তিনি মাকামে মাহমুদ বা প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়–ন, যা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত ইবাদাত। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৭৯)
মাকামে মাহমুদের শাব্দিক অর্থ প্রসংশনীয় স্থান। এটি রাসুল (সা.)-এর একটি বিশেষ মর্যাদা, যার কারণে তিনি সুপারিশ করার অধিকার পাবেন। এমন শ্রেষ্ঠ নবীর সুসংবাদ পূর্ববর্তী নবীরা তাদের উম্মতদের দিয়েছেন।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘স্মরণ করুন সেই সময়কে, যখন ইসা ইবনে মারইয়াম বলেছিল, হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল হয়ে এসেছি, আমার পূর্বে যে তাওরাত ছিল, তার সমর্থনকারীরূপে এবং সেই রাসুলের সুসংবাদদাতারূপে, যিনি আমার পরে আসবেন এবং যার নাম হবে আহমদ। অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলিসহ আসল তখন তারা বলতে লাগল, এ তো এক স্পষ্ট যাদু। (সুরা সফ ৬) রাসুল (সা.)-এরই নাম আহমদ। ইসা (আ.) এই নামেই শেষ নবীর সুসংবাদ দিয়েছেন।
ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে এমন একজন নবীর দরখাস্ত করেছিলেন, যিনি হবেন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্যে এমন একজন রাসুলও প্রেরণ করুন, যে তাদেরই মধ্য হতে হবে এবং যে তাদের সামনে আপনার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবে, তাদেরকে কিতাব ও হেকমতের শিক্ষা দেবে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা বাকারা ১২৯)
এমন নবীর উম্মত হওয়া আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। তাই রাসুল (সা.)-এর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা আমাদের দায়িত্ব।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার