‘অস্তিত্বের’ শঙ্কায় দেশি শিল্পোদ্যোক্তারা

শুরু থেকেই মোবাইল অপারেটরদের হাতে জিম্মি দেশের টেলিকম খাত। দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে মোবাইল অপারেটরদের স্বার্থে টেলিযোগাযোগ খাতের নতুন লাইসেন্সিং নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হলে এর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে টিআরএনবি (টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। সভায় টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন স্তরের দেশীয় উদ্যোক্তারা অংশ নেন।

সভায় বক্তারা বলেন, ২০০৮ সালে আইডিএলটিএস পলিসি এই খাতের একাধিপত্য ভাঙতে সক্ষম হয়। কিন্তু নতুন নীতিমালায় ফের বিদেশি কোম্পানির কাছে জিম্মি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেননা, আইএসপির লাইসেন্স ফি ৫ গুণ বেড়েছে। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের ওপর ৯০ শতাংশ সুবিধাভোগ করবে বিদেশি অপারেটর।

তাদের দাবি দেশীয় উদ্যোক্তা ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে সাধারণ গ্রাহকপর্যায়ে দাম বাড়বে ৭৫ শতাংশ। এ ছাড়াও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ৫ মন্ত্রীর অধীনে এনে বিটিআরসিকে ‘রাবার স্ট্যাম্প’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে বার বার নতুন নীতি নিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতের দেশীয় শিল্পদ্যোক্তাদের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু সেটা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং শুধু বিদেশি তিনটি মোবাইল অপারেটরকে টেলিযোগাযোগ খাতের সব ব্যবসার সুবিধা দিয়ে গাইডলাইন চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর ফলে এ খাতের সব স্তরের দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারাই ব্যবসা হারিয়ে অস্তিত্বহীন হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে পড়ে যাবে। অথচ দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। সুলভ মূল্যে দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিয়েছেন। এখন নীতিমালায় শুধু বিদেশি অপারেটরদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হলে ইন্টারনেটের দাম কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়বে এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ কার্যত ইন্টারনেট বঞ্চিত হবে।

তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেন, যদি শেষ পর্যন্ত দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করা ধারাগুলো রেখেই গাইডলাইন চূড়ান্ত করা হয় তাহলে এর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এ সরকারের সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কোনো সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও টেলিযোগাযোগ খাতে কার স্বার্থে তড়িঘড়ি করে এত সংস্কারের পদক্ষেপ কেন, তা অবশ্যই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

আইএসপিবি সাধারণ সম্পাদক নাজমুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা মনে করি, ইন্টারনেট মানে ইন্টারনেট হবে। মোবাইল, কৃত্রিম উপগ্রহ এমন নানাভাবে ভাগ করতে চাই না। অসম প্রতিযোগিতা আরও বেগবান হবে।’

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ২০০৮ সালের আইএলডিটিএস পলিসির সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংস্কারের একটা পর্যায়ে এসে দেখা গেল সংস্কার হচ্ছে শুধু কোনো একটি পক্ষের স্বার্থে এবং এই সংস্কারের ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব ভীষণভাবে সংকটে পড়ছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যেখানে দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নীতি গ্রহণ করছে, সেখানে বাংলাদেশে একেবারে বিপরীত চিন্তা দেখা যাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক আবু নাজম মুহাম্মাদ তানভীর হোসেন বলেন, বিভিন্ন প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে ইন্টারনেট বন্ধের প্রয়োজন হতে পারে। আগেও এটা হয়েছে। কিন্তু কেউ দায় নেয়নি। তাই এ জন্য একটি প্রোটোকল থাকা উচিত। ইন্টারনেট যদি বন্ধ করা হয়, তাহলে দায়িত্ব নিতে হবে এমন নির্দেশনা থাকা উচিত। এ জন্য একটি আইনি কমিটি থাকা উচিত।

সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও ভিউজ বাংলাদেশ সম্পাদক রাশেদ মেহেদীর সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক মাসুদ কামাল, সামিট কমিউনিকেশনের চিফ টেকনোলজি অফিসার কে এম তারিকুজ্জামান, বাহন লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার রাশেদ আমিন বিদ্যুত, ফাইবার অ্যাট হোমের চিফ কমিউনিকেশন অফিসার আব্বাস ফারুক, আইসিএক্স অপারেটরদের সংগঠন এওআইবির কেন্দ্রীয় নেতা এম নুরুল আলম এবংু টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন।