বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের 'চোখে চোখ' রেখে লড়াই করতে চায় বাংলাদেশ

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর ওমানের মাসকটে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশের যুবারা। জুনিয়র এশিয়া কাপের পঞ্চমস্থান নির্ধারণী ম্যাচে চীনকে ৬-৩ গোলে হারিয়ে ২০২৫ জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে নাম লেখায় অনূর্ধ্ব-২১ দল। হকির যে কোন পর্যায়ে প্রথম কোন বৈশ্বিক আসরে জায়গা হয় বাংলাদেশের। আরেকটি ডিসেম্বর যখন এগিয়ে আসছে তখন বাংলাদেশের যুবারা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বকাপে খেলার। ২৮ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত হবে এই আসর। তবে এখানে খুব বড় কোন লক্ষ্য নিয়ে যাচ্ছে না বাংলাদেশ। লক্ষ্য শুধুই ভালো খেলা। বড্ড সাদাসিধে লক্ষ্যের নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে বের হয়ে এসেছে হকি ফেডারেশনের উদাসীনতার চিত্র। বড় একটা সময় পেয়েও দলকে ভালো প্রস্তুতির সুযোগ করে দেয়নি ফেডারেশন। চার-সাড়ে চার মাসের প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হবে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রবল প্রতিপক্ষদের।

অনেক না হওয়ার মাঝে ফেডারেশন যেটা করেছে, তারা দলের দায়িত্ব দিয়েছে একজন অভিজ্ঞ কোচের হাতে। ডাচ কোচ সেগফ্রাইড আইকম্যানের অধীনে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে অনুশীলন নিচ্ছে বাংলাদেশ যুব দল। অতীতে এশিয়া, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় নানা জায়গায় কাজ করা এই কোচ অল্প দিনেই বাংলাদেশের দুর্বলতাগুলো বের করে ফেলেছেন। তার চোখে এ দেশের হকি আকড়ে রয়েছে সনাতনী ধ্যান ধারণা। আধুনিকতার ছোঁয়া খুব কমই পেড়ছে। নিয়মিত ঘরোয়া খেলা হয় না বলে ভালোমানের কোচ উঠে আসছে না। ফলে প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা হকির বর্তমানের সঙ্গে খেলোয়াড়দের যোগাযোগের পথটা ভীষণ সরু। তার ওপর ফেডারেশন যখন নির্বিকার, তখন তো বিদেশী কোচের তেমন কিছুই করার থাকে না। তারপরও আইকম্যান জোর চেষ্টা করছেন গতিশীল হকির সঙ্গে ছেলেদের অভ্যস্ত করে তুলতে। আর সবচেয়ে বেশি তরুণদের সাহসী করে তোলার চেষ্টা করছেন। যাতে নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে পারে। দল নিয়ে কাজ করার সুযোগ বড্ড কম পেয়েছেন ডাচ কোচ।

জার্সি উন্মোচন করা হয়

ডিসেম্বরে নিশ্চিত হওয়ার পর কেন আট মাস কোন হেলদোল হলো না? কেন এই তরুণদের সেরা প্রস্তুতির সুযোগ করে দেওয়া হলো না? রবিবার দলের জার্সি উন্মোচন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে হওয়া সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হাসানকে। তিনি ফেডারেশনের ব্যর্থতা শিকার করে নিয়েছেন, 'আমি আগেও বলেছি, যদি ক্ষমতা থাকতো নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই ছেলেদের জন্য উন্নতমানের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতাম। আসলে অর্থ সঙ্কটে আমাদের দেরীতে শুরু করতে হয়েছে। আমি বলেছিলাম নিদেনপক্ষে পাঁচ মাস সময় ধরে অনুশীলন করাবো। সেটাও করাতে পারিনি। একমাস কম করাতে হয়েছে। আপনারা জানেন, একটি দলকে দীর্ঘ সময় ক্যাম্পে রেখে, প্রস্তুতি ম্যাচ খেলিয়ে শতভাগ প্রস্তুত করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। আমরা সরকারের কাছে সহযোগীতা চেয়েছি, হয়তো সেটা আমরা কিছুদিনের মধ্যে পাবো। তাছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে কিছু পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছি। এ সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দলের পেছনে ৫ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমাদের সামর্থ্য থাকলে আর্ আগে ক্যাম্প শুরু করতাম। এর জন্য আমি দুঃখপ্রকাশ করছি।'

দলটিকে ইউরোপে পাঠিয়ে বেশি কিছু প্রস্তুতি ম্যাচ খেলিয়ে আনার কথা ছিল। সেটা শেষ পর্যন্ত করতে পারেনি ফেডারেশন। মালয়েশিয়ায় গিয়ে কিছুদিন অনুশীলন আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে ১৮ নভেম্বর ভারত যাবে দল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে অবশ্য চিলি ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সম্ভাবণা আছে বাংলাদেশ দলের। প্রস্তুতির ঘাটতি আছে। তারপরও তরুণদের কাছে ভালো কিছুর প্রত্যাশা ফেডারেশন কর্তাদের। সবার সঙ্গে পরিচিতিপর্ব শেষে ফেডারেশনের সভাপতি ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান্ দলকে অকুতোভয় থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, 'শৃঙ্খলা সাফল্যের চাবিকাঠি এবং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ দল সবসময় জয়লাভ করে। মাঠের খেলায়  ১১ বনাম ১১ লড়াই হয়, প্রতিপক্ষ কোন দেশ বা দল বড় নয়, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে এবং ভাল নৈপুণ্য প্রদর্শন করবে এটিই আমার প্রত্যাশা।'

২৯ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করবে বাংলাদেশ। দক্ষিণ কোরিয়া ও ফ্রান্সের সঙ্গে খেলবে বাকি দুই ম্যাচ। এই বিশ্বকাপে ২৪ দল ৬ গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রথম রাউন্ড খেলবে। 

আইকম্যান বলেছেন কোন লক্ষ্য স্থির করে শীষ্যদের চাপে ফেলতে চান না, 'আমাদের ওরকম কোন লক্ষ্য নেই্। এই ছেলেদের বড় মঞ্চের জন্য চেষ্টা করেছি গড়ে তুলতে। আমি তাদের বলেছি, সাহস না হারাতে। হৃদয় দিয়ে খেলতে। তবে হয়তো কোন বিস্ময়কর কিছুও হয়ে যেতে পারে।'

দলের অধিনায়ক মেহরাব হাসান সামিন আইকম্যানের অধীনে থাকাটা বড় সহায়ক হয়েছে বলে জানান, 'আমরা এখন ইউরোপিয় ধারাটা বুঝতে পেরেছি, আইকম্যানের মতো বড় কোচের অধীনে দলের খেলার ধারায়ও পরিবর্তন হয়েছে। আমরা গ্রপের কোন দলকে অসম্মান করবো না আবার সমীহও করবো না। চেষ্টা করবো চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে।'

জাতীয় যুব হকি দল

মাহমুদ হাসান, আশরাফুল হক, মেহরাব হোসেন সামিন, রামিন হোসেন, এনাম শরীফ, মুন্না ইসলাম, রাহিদ হাসান, আজিজার রহমান, সাব্বির হোসেন কনক, দ্বীন ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, ইসমাইল হোসেন, আমিরুল ইসলাম, হোজিফা হোসেন, ওবায়দুল হোসেন জয়, তানভীর রহমান, রাকিবুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ ও শহীদুর রহমান সাজু।