নবীজি কথা বলতেন যেভাবে

মহান আল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে সব উৎকৃষ্ট গুণের সমাহার ঘটিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় কথা বলা। তিনি ছিলেন বিশুদ্ধভাষী। তার কথা ছিল স্পষ্ট। তিনি খুব দ্রুত কথা বলতেন না, আবার খুব আস্তেও কথা বলতেন না। এমনভাবে কথা বলতেন, যা সবাই প্রথমবারেই সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারত। দ্বিতীয়বার বলতে হতো না।

তৎকালীন আরবে বিশুদ্ধ ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে বনু সাদ গোত্র সবার কাছে প্রসিদ্ধ ছিল। নবীজি (সা.) সেই গোত্রেই বেড়ে ওঠেন। তাই ছোটবেলায় তিনি বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে শিখেন। মহান আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে বিশুদ্ধভাষী হিসেবে অন্য নবীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে ব্যাপক অর্থবোধক সংক্ষিপ্ত কথা বলার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং প্রবল প্রভাব দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম ১০৫৯)

তৎকালীন আরবে ভাষা বিপ্লব নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমেই সাধিত হয়েছিল। এক সময় আরবি ভাষায় রচিত হতো অশ্লীল কবিতা, যেখানে কবিরা নারীর দেহাবয়বের বর্ণনা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে। কিন্তু নবীজি (সা.) প্রেরিত হওয়ার পর ভাষার মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরে যায়। কবিরা তখন আল্লাহর মহিমা ও বড়ত্বের বর্ণনা দিয়ে কবিতা রচনা করতেন। হাসসান বিন সাবিত (রা.) ছিলেন তেমনই একজন কবি।

নবীজি (সা.)-এর ভাষার ওপর ভিত্তি করেই আরবি ব্যাকরণ গড়ে উঠেছে। তৎকালীন আরবিভাষী সাহিত্যিকরাও নবীজির ভাষা ও বর্ণনার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, জিমাদ (রা.) মক্কায় এলেন। তিনি ছিলেন আজদ শানুয়া গোত্রের লোক। তিনি বাতাস লাগার ঝাড়ফুঁক করতেন। তিনি মক্কার কতিপয় নির্বোধ লোককে বলাবলি করতে শুনলেন, মুহাম্মদ (সা.) উন্মাদ। জিমাদ (রা.) বললেন, আমি যদি এ লোকটিকে দেখতাম, হয়তো আমার হাতে আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করতেন।

বর্ণনাকারী বলেন, তিনি নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং বললেন, হে মুহাম্মদ! আমি সেসব ব্যাধির ঝাড়ফুঁক করে থাকি এবং আল্লাহ আমার হাতে যাকে ইচ্ছা আরোগ্য দান করেন। আপনি কি ঝাড়ফুঁক করতে ইচ্ছুক?

নবীজি (সা.) বললেন, সব প্রশংসা আল্লাহরই জন্য, আমি তারই প্রশংসা বর্ণনা করছি, তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে হেদায়াত দেন কেউ তাকে গোমরাহ করতে পারে না। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ হেদায়াত করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ নেই। তিনি এক, তার কোনো শরিক নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সা.) তার বান্দা ও রাসুল।

অতঃপর বর্ণনাকারী বলেন, তিনি (জিমাদ) বললেন, আপনার বাক্যগুলো পুনরাবৃত্তি করুন। নবীজি (সা.) তিনবার পূনরাবৃত্তি করলেন। অতঃপর জিমাদ (রা.) বলেন, অনেক গণক, জাদুকর ও কবিদের কথাবার্তা শুনেছি, কিন্তু আপনার এ বাক্যগুলোর মতো আর শুনিনি। আপনার এ বাক্যগুলো সাগরের গভীরতায় পৌঁছে গিয়েছে।

বর্ণনাকারী বলেন, জিমাদ (রা.) বললেন, হাত বাড়িয়ে দিন আমি আপনার কাছে ইসলামের বাইয়াত গ্রহণ করব। নবীজি (সা.) তাকে বাইয়াত করে নিলেন। (সহিহ মুসলিম ১৮৯৩)

নবীজি (সা.) সবসময় বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন এবং তার সাহাবিদেরও বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করতেন। রিবায়ি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনি আমিরের এক ব্যক্তি তাকে জানান, তিনি নবীজি (সা.)-এর ঘরে অবস্থানকালে তার কাছে অনুমতি চেয়ে বলেছিলেন, আ-আলিজু (আমি কি আসতে পারি)? এই শব্দটি আরবি ভাষায় প্রবেশ করা অর্থে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে প্রমিত নয়। নবীজি (সা.) খাদেমকে বললেন, তুমি বের হয়ে তার কাছে গিয়ে তাকে অনুমতি নেওয়ার নিয়ম শিখিয়ে দাও। তুমি তাকে বলো, আসসালামু আলাইকুম, আ-আদখুলু (প্রমিত শব্দ) আমি কি ভেতরে আসতে পারি? লোকটি এ কথা শুনে বলল, আসসালামু আলাইকুম, আ-আদখুলু (আমি কি ভেতরে আসতে পারি)? নবীজি (সা.) তাকে অনুমতি দিলেন এবং সে ভেতরে প্রবেশ করল। (আবু দাউদ ৫১৭৭)

লেখক : আলেম ও শিক্ষক