কম্পিউটার সেন্টারের ভুলেই ‘পিয়াল’ হয়েছিল ‘সাদিয়া’

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের ভুলেই ‘পিয়াল’ হয়েছিল ‘সাদিয়া’। এতে কোনো ঘুষ বাণিজ্যের ঘটনাও ঘটেনি। তবে এই ভুলে পিয়ালের শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে গেল একটি বছর। এ বছর কলেজে ভর্তি হতে পারেনি পিয়াল। পরপর দুই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে একই কারণ বেরিয়ে এসেছে।

পিয়াল সাদিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই রিপোর্ট প্রকাশের পর বোর্ডের পক্ষ থেকে একটি অধিকতর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি গত মঙ্গলবার শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে রিপোর্ট জমা দেয়। সেই রিপোর্টে কী আছে জানতে চাওয়া হয়েছিল অধিকতর তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু ছালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দীনের কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিয়াল সাদিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের ভুল ছিল। এই সেন্টারে যারা কাজ করেছে তাদের ভুলের কারণে খাগড়াছড়ির গুইমারা এলাকার গরিব শিক্ষার্থী পিয়ালের জীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে গেছে। তাদের ভুলের কারণে তার অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট যথাসময়ে সংশোধন না হওয়ায় কলেজে ভর্তির সময় শেষ হয়ে গেছে।’

কিন্তু এ ঘটনায় যে ১০ লাখ টাকা ঘুষ প্রদান হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। এই অভিযোগ কি সত্যি? এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর আবু ছালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন বলেন, ‘আমরা অভিযোগকারীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম কিন্তু অভিযোগকারী এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এ ছাড়া আর্থিক লেনদেনের কোনো সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যায়নি।’ এ অভিযোগের ভিত্তিতেই তো প্রথম দফা তদন্ত কমিটি হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট সংশোধন বাবদ ১০ লাখ টাকা ঘুষের কথা বলা হয়েছিল অভিযোগপত্রে। কিন্তু অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট তো সংশোধনই হয়নি। আমরা আমাদের রিপোর্টে দ্রুত তা সংশোধন করে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছি।’

এর আগে একই ইস্যুতে অভিযোগকারীর বিষয়ে প্রথম দফায় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর আবুল কাশেম রিপোর্টের ৫ নম্বর সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন, ‘তদন্ত কমিটি উক্ত কাজে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেনের সংশ্লিষ্টতা পায়নি। অভিযোগকারী এর সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি বরং অভিযোগের বিষয়ে তার উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। এরূপ ভিত্তিহীন অভিযোগে বোর্ডের সুনাম ক্ষুণœ করে।’ অন্যদিকে অধিকতর তদন্ত কমিটির রিপোর্টেও একই বক্তব্য উঠে এসেছে যে, এতে অভিযোগকারীর উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। অভিযোগের সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি।

তবে সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভুল ছিল উল্লেখ করে অধিকতর তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর আবু ছালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন বলেন, ‘শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে ভুল সংশোধনের আবেদনটি নথিভুক্ত করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের। কিন্তু তিনি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বাঁচাতে দ্রুত সংশোধন করতে গিয়ে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধন করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। এতে কোনো খারাপ ইনটেনশন ছিল না বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।’ একই মন্তব্য প্রথম তদন্ত কমিটিও করেছিল। তাদের রিপোর্টের ৪ নম্বর সুপারিশে উল্লেখ ছিল ‘সংশোধনের প্রক্রিয়াটি নথিভুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করলে ভালো হতো।’

এদিকে উভয় তদন্ত কমিটির রিপোর্টে শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের ভুলকে উল্লেখ করলেও এতে সন্তুষ্ট নন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘আমি কালো বিড়াল শনাক্তের জন্য প্রথম তদন্ত কমিটি গঠনের পর অধিকতর তদন্তের জন্য আরও একটি কমিটি গঠন করেছি। কিন্তু এখনো কালো বিড়াল শনাক্ত করতে পারিনি। তাই এই রিপোর্টেও আমি সন্তুষ্ট নই।’

তাহলে কি আপনি আরও তদন্ত করবেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত মঙ্গলবার আমি তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। তবে প্রকৃত কালো বিড়াল বের করার জন্য আমি কাজ করে যাব।’

পূর্বের প্রেক্ষাপট : মেয়ের পরীক্ষা ছেলে দিয়েছে এবং এতে ১০ লাখ টাকার ঘুষ বিনিময় হয়েছে বলে গত ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন নাঈম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, খাগড়াছড়ির শহীদ লে. মুশফিক হাইস্কুলের পরীক্ষার্থী সাদিয়া জাহান লাভলী, রোল নং-৭১৪৭৬৮, রেজিস্ট্রেশন নং-২১১৪৪৬৯২১৭-এর নাম পরিবর্তন করে পিয়াল আশরাফ শান্তর নামে তৈরি করার আচরণ দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অভিযোগটি গুরুতর বিধায় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তা অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। এদিকে এ অভিযোগের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর আবুল কাশেমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটি রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর অধিকতর তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু ছালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দীনকে আহ্বায়ক এবং সরকারি মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আবু শাহারিয়া মো. নোমান ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অডিট অফিসার তাজুল ইসলামকে সদস্য করে কমিটি গঠন করে। কমিটি গত মঙ্গলবার চেয়ারম্যানের কাছে রিপোর্ট জমা দেয়।

যা ঘটেছিল : পিয়াল আশরাফ শান্ত নামের শিক্ষার্থীটি খাগড়াছড়ি গুইমারা রিজিয়নের শহীদ (লে.) মুশফিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। ২০২৪ সালে রোল নম্বর ছিল-১৬০০৩৬ এবং রেজি. নম্বর ছিল ২১১৪৪৬৯২১৭। ২০২৪ সালের পরীক্ষায় পিয়ালের প্রবেশপত্রে তার ছবির জায়গায় একটি মেয়ের (সাদিয়া জাহান লাভলী) ছবি প্রিন্ট হয়। কিন্তু তারপরও সে যথারীতি পরীক্ষা সম্পন্ন করে এবং গণিতে ফেল করে। পরে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ফরম পূরণের পর গণিত পরীক্ষার দিন পরীক্ষা দিতে এলে প্রবেশপত্রে ভুল ধরা পড়ে। ছবির জায়গায় পিয়াল আশরাফ শান্তর ছবি থাকলেও শিক্ষার্থীর নামের জায়গায় সাদিয়া জাহান লাভলী এবং পিতা ও মাতার নামের জায়গায় পিয়ালের পরিবর্তে সাদিয়ার বাবা মায়ের নাম দেখা যায়। এই ভুল উপাত্ত দিয়ে পিয়াল পরীক্ষা দেওয়ার পর তা সংশোধনের জন্য গত ২৪ আগস্ট আবেদন করে। এদিকে পিয়াল এক বিষয়ের পরীক্ষায় পাস করে ৩.৭৮ জিপিএ পেয়ে থাকে। কিন্তু তার অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টে সাদিয়ার তথ্যাবলি থাকায় কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারেনি। ফলে তার শিক্ষাজীবন থেকে একটি বছর ঝরে যায়। অন্যদিকে পিয়াল বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হলেও সাদিয়া জাহান লাভলী ছিল খাগড়াছড়ি গুইমারা এলাকার হাপছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ২০২৪ সালের পরীক্ষার্থী। সাদিয়া ২০২৪ সালেই ২.৭২ জিপিএ পেয়ে পাস করে যায় এবং বর্তমানে কলেজে অধ্যয়ন করছে।

শিক্ষার্থী। পিয়ালের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ঠিক থাকলেও তার প্রবেশপত্রে কীভাবে সাদিয়ার নাম এলো এবং তার সংশোধনের আবেদনে নথিভুক্ত না করে কীভাবে সংশোধনের জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আদেশ দিয়েছিল তা নিয়ে ধম্রজাল সৃষ্টি হওয়ায় একের পর এক তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে একের পর এক অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। অনিয়মের কারণে বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের সব কর্মকর্তাদের বদলি করে নতুনদের দায়িত্ব দেওয়া হলেও অনিয়মের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না বোর্ড। এর মধ্যে গত এসএসসি পরীক্ষায় পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফলেও ৩৪টি উত্তরপত্রে অধিক নম্বর বসানোর ঘটনা ঘটেছিল, যা পরে শনাক্ত হয়ে যাওয়ায় আর ফলে যুক্ত হতে পারেনি।