দেশকে সংঘাতের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে

গণভোটের নামে দেশকে সংঘাতের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম মেম্বার এবং সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।  তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার সাংবিধানিক আদেশ ও গণভোটের মধ্য দিয়ে দেশকে দীর্ঘমেয়াদি এক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন মোড়কে পুরনো ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করছে বর্তমান সরকার। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সিপিবি জাতীয় সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের দিনে ‘গণভোটের’ জন্য ড. ইউনূস যে প্রস্তাবনা হাজির করেছেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ঐকমত্যের কথা বলে একটি ভুয়া দলিল রচনা করেছে। সাংবিধানিক আদেশ বলবৎ করে সরকার যা করতে যাচ্ছে গণভোটের মধ্য দিয়ে তার বৈধতা হবে না। ঐকমত্যের বাইরে কোনো বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, এবারকার যুক্তফ্রন্ট হবে বিপ্লবীদের যুক্তফ্রন্ট, সমস্ত বামপন্থিদের ফ্রন্ট। আমি মনে করি সেই ফ্রন্টের নেতৃত্ব দিতে হবে কমিউনিস্ট পার্টিকে। তাদের আওয়াজ তুলতে হবে সমাজবিপ্লবীরা এক হও। আশা করি কমিউনিস্ট পার্টির এ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

সিপিবির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহ আলম বলেন, আমরা জুলাই সনদে সই করি নাই। সেই ফাঁদে আমরা পা দিই নাই। পা দিয়েছে বিএনপি। সংবিধান বাতিল করে দিতে হবে, চার মূলনীতি বাতিল করতে হবে এগুলো ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ছিল না। ২৪-এর আকাক্সক্ষা ছিল গণতন্ত্র ও বৈষম্যবিরোধিতা। এসব অ্যাজেন্ডা এনেছে এনসিপি, ঐকমত্য কমিশন আর জামায়াতে ইসলামী।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সনদের নামে বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধকে ধ্বংস করতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি বাদ দিয়ে ৭৪-এর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। ছলে-বলে-কৌশলে সেটা করতে চায় তা প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে পরিষ্কার।, এই সরকারকে অনেক সময় দেওয়া হয়েছে। অনতিবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দিন। গণভোট এখন অপ্রয়োজনীয়।

সিপিবির সভাপতি, কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাকে আমরা চ্যালেঞ্জ করতে চাই। বহু সরকার আমরা দেখেছি। আমরা মনে করি, এবার বামপন্থি কমিউনিস্ট গণতান্ত্রিক সরকার আমাদেরকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নইলে বাংলাদেশ বাঁচবে না।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, যে লক্ষ্য নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ইউনূস সরকার তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান জনতার বেহাত হয়েছে। সরকার নারীদের, সংখ্যালঘু মানুষের কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা নেয়নি। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের দাবিদার একটি গোষ্ঠী নতুন করে লুটপাট ও দখলদারিত্বের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রফিকুজ্জামান লায়েক ও জলি তালুকদারের পরিচালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রাগিব আহসান মুন্না, এসএ রশীদ, মো. আমিনুল ফরিদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. দিবালোক সিংহ।

সমাবেশে বন্ধুপ্রতীম রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাসদ এর প্রধান উপদেষ্টা কমরেড খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া। প্রান্তিক ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সুরেশ্বর দরবার শরীফের পীর সাহেব শাহ সূফী হাসান শাহ সুরেশ্বরী দিপু নূরী, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়নের সভাপতি রেবেকা সরেন, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি কৃষ্ণলাল।

সমাবেশ থেকে নির্বাচনে জামানতের অর্থ কমানো ও প্রার্থীদের সমতা নিশ্চিত করার দাবিতে ২৪ নভেম্বর, সোমবার নির্বাচন কমিশন ঘেরাও এবং জেলা ও উপজেলায় নির্বাচন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এ ছাড়া লালদিয়া টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ১৬ নভেম্বর, রবিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ২৮ নভেম্বর, শুক্রবার ঢাকায় নারীদের রাজনৈতিক কনভেনশন এবং ২৯ নভেম্বর, শনিবার বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদ-সহ বাম-গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল দলসমূহের উদ্যোগে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় জনগণের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠানের ঘোষণা করা হয়।

সমাবেশ শেষে একটি বিশাল মিছিল শাহবাগ হয়ে বাটা সিগন্যাল, সাইন্স ল্যাব, ঢাকা কলেজ, গাউসিয়া মার্কেট থেকে বামে ঘুরে আবারও বাটা সিগনাল, শাহবাগ হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে শেষ হয়।