আত্মহত্যার বিরুদ্ধে ইসলামের হুঁশিয়ারি

জীবন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক অতুলনীয় আমানত। সুখ ও দুঃখের সমন্বয়ে গড়া এই পৃথিবীতে মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি পরীক্ষা। কিন্তু কখনো কখনো মানুষ জাগতিক হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে এমন এক চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা কেবল তার ইহকালই নয়, পরকালকেও ধ্বংস করে দেয়। বাংলাদেশে অপমৃত্যুর মিছিল যেন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। তুচ্ছ অভিমান, পারিবারিক কলহ কিংবা ক্ষণিকের হতাশায় মানুষ বেছে নিচ্ছে আত্মহননের মতো বিধ্বংসী পথ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ আত্মহত্যা প্রবণতায় বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর একটি, যা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এক চরম বার্তা দেয়। অথচ একজন মুমিনের জীবনে হতাশার কোনো স্থান নেই। ক্ষণস্থায়ী কষ্টের ভয়ে মানুষ কেন চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি নিজের কাঁধে তুলে নেয় এবং ইসলাম এ বিষয়ে কতটা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, তা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি।

আত্মহত্যা মহাপাপ। সব ফিকহবিদ এবং চার মাজহাবেই আত্মহত্যা হারাম। এগুলো আত্মহননকারী ব্যক্তিরও অজানা নয়। তবু হতাশা, অধৈর্য ও পারিবারিক নানা কলহে মানুষ এ জঘন্য পথটি বেছে নেয়। আর কারও স্বাভাবিক মৃত্যুর পর স্বজনদের যে কষ্ট হয়, আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবন শেষ করলে সেই কষ্ট আরও কয়েক গুণ বেশি হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের জন্য আত্মহত্যা একটি দুঃখজনক বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রবণতার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বাংলাদেশে প্রতি বছর কমপক্ষে ১৩ হাজার থেকে ৬৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। ২০১১ সালে বাংলাদেশের মানুষের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৬৯৭ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের মতে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ১১ হাজার ৯৯ জন আত্মহত্যা করেছে। ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৭৩ হাজার ৩৮৯ জন আত্মহত্যা করেছে।

আত্মহত্যা মানে নিজকে নিজে ধ্বংস করা। নিজ আত্মাকে চরম কষ্ট ও যন্ত্রণা দেওয়া। নিজ হাতে নিজের জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের পরিসমাপ্তি ঘটানো। তুচ্ছ পারিবারিক কলহ, বিদ্যালয়ের গমনাগমন পথে বখাটেদের উৎপাত, ভালোবাসায় ব্যর্থতা ও প্রতারণা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে তরুণীরা এবং স্বামীর নির্যাতন-অত্যাচার, যৌতুক সমস্যা, স্বামীর অর্থনৈতিক অক্ষমতা, পারিবারিক অশান্তি থেকে বাঁচার পথ হিসেবে অনেক নারী আত্মহত্যাকে বেছে নেয়। এ সবই ভুল, এসব সমস্যা সব দেশে, সব জাতিতে আছে। আত্মহত্যা এসবের কোনো সুষ্ঠু সমাধান কিংবা সঠিক প্রতিকার নয়।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০১০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে যারা আত্মহত্যা করেছিলেন তাদের মধ্যে ৮৯% নারী ছিলেন এবং তাদের বেশিরভাগই অবিবাহিত ছিলেন।

আল্লাহতায়ালা মানুষকে মরণশীল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ধনী-গরিব, বিদ্বান-মূর্খ, রাজা-প্রজা সবাইকে মরতে হবে। আর এ মৃত্যু দান করেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া কেউ কাউকে মৃত্যু দিতে পারে না। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। আর তার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে।’ (সুরা ইউনুস ৫৬)

বর্ণিত আয়াতের স্পষ্ট কথা, মানুষের মৃত্যু ঘটানোর কাজটি একমাত্র আল্লাহর। অতএব কেউ যদি কাজটি নিজের হাতে তুলে নেন, নিজের মৃত্যু ঘটান নিজের হাতে, তবে তিনি অনধিকার চর্চাই করবেন। আল্লাহ তা পছন্দ করেন না। কেউ অনধিকার চর্চা প্রত্যাশা করে না। ইসলামে তাই আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলে গণ্য করা হয়েছে।

এ কাজ থেকে বিরত থাকতে মহান আল্লাহ বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর পরিণামের কথা ভাববার জন্য কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির বর্ণনা দিয়ে পবিত্র কোরআনে আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, ‘আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। যে কেউ জুলুম করে, অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্যই আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করব, আল্লাহর পক্ষে তা সহজসাধ্য।’ (সুরা নিসা ২৯-৩০) অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা ১৯৫)

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসংখ্যা হাদিসে আত্মহত্যা থেকে বিরত থাকার জন্য নানাভাবে বারণ করেছেন। এ থেকে মানুষকে সতর্ক করেছেন। যেমন হজরত সাবিত বিন জাহহাক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো বস্তু দিয়ে আত্মহত্যা করল, আল্লাহতায়ালা তাকে জাহান্নামে সেই বস্তু দিয়েই শাস্তি দেবেন।’ (সহিহ বুখারি)

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে যাবে। সেখানে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সেই তার বিষ তার হাতে থাকবে। জাহান্নামে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে বিষ খাইয়ে মারতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করে তার কাছে জাহান্নামে সেই ধারালো অস্ত্র থাকবে যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি)

হজরত জুনদাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘জনৈক ব্যক্তি গুরুতর আহত হলে সে তার ক্ষতগুলোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। অতঃপর আল্লাহতায়ালা বললেন, আমার বান্দা স্বীয় জান কবজের ব্যাপারে তড়িঘড়ি করেছে, অতএব আমি তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ (সহিহ বুখারি)

আত্মহত্যা তো দূরের কথা, ইসলাম কোনো বিপদে পড়ে বা জীবন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে নিজের মৃত্যু কামনা করতে পর্যন্ত বারণ করেছে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কোনো বিপদে পতিত হয়ে মৃত্যু কামনা না করে। মৃত্যু যদি তাকে প্রত্যাশা করতেই হয় তবে সে যেন বলে, হে আল্লাহ! আমাকে সে অবধি জীবিত রাখুন, যতক্ষণ আমার জীবনটা হয় আমার জন্য কল্যাণকর। আর আমাকে তখনই মৃত্যু দিন যখন মৃত্যুই হয় আমার জন্য শ্রেয়।’ (সহিহ বুখারি)

মানুষের জীবনের প্রতিটি দিন এক রকম কাটে না। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন সর্বত্রই পরিবর্তন হতে থাকে। কখনো দিন কাটে সুখে, কখনো কাটে দুঃখে। কখনো আসে সচ্ছলতা। আবার কখনো দেখা দেয় দরিদ্রতা। কখনো থাকে প্রাচুর্য, কখনো আবার অভাব-অনটন। কখনো ভোগ করে সুস্থতা, কখনো আক্রান্ত হয়ে পড়ে রোগ-শোকে। কখনো দেখা দেয় সুদিন, আবার কখনো আসে দুর্ভিক্ষ। কখনো আসে বিজয়, আবার কখনো আসে পরাজয়। কখনো আসে সম্মান, আবার কখনো দেখা দেয় লাঞ্ছনা। এ অবস্থা শুধু বর্তমান আমাদের সময়েই হয়ে থাকে, তা নয়। এটা যুগ যুগ ধরে এভাবেই আবর্তিত হয়ে আসছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারপর আমি মন্দ অবস্থাকে ভালো অবস্থা দ্বারা বদলে দিয়েছি। অবশেষে তারা প্রাচুর্য লাভ করেছে এবং বলেছে, আমাদের বাপ-দাদাদেরও দুর্দশা ও আনন্দ স্পর্শ করেছে।’ (সুরা আরাফ ৯৫)

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার প্রবণতায় ভোগেছিল। যেহেতু বিপদ-আপদ, কষ্ট-শোক মানুষের নিত্যসঙ্গী, তাই সমাজ থেকে আত্মহত্যা নির্মূলে প্রথমত দরকার পুরো সমাজব্যবস্থায় ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের বাস্তব অনুশীলন। কারণ, মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় হতাশার চরম মুহূর্তে। আর অনুশীলনরত মুসলিম জীবনে হতাশার কোনো স্থান নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, হে আমার বান্দারা! যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার ৫২)

যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, যাবতীয় ভালো-মন্দ সবই আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ যাই করেন বান্দার তাতে কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে, সে কখনো নিজের জীবন প্রদীপ নিজেই নেভাবার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সে তো হাজার বিপদেও অবিচল থাকবে এ বিশ্বাসে যে আল্লাহ আমাকে পরীক্ষা করছেন। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে অবশ্যই তিনি আমাকে পুরস্কৃত করবেন। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রথম দরকার ইসলামি শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের বাস্তবানুশীলন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার