যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত মাসে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির পর থেকে উপত্যকাটিতে অন্তত ৬৭ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। গত শুক্রবার জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস জানান, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একটি মেয়েশিশু মারা গেছে। এর আগের দিন গোটা উপত্যকা জুড়ে ইসরায়েলের ব্যাপক হামলায় আরও সাত শিশু নিহত হয়। পাশাপাশি পৃথক এক প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী সংঘাতে প্রায় ১২ হাজার শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। এর ৭০ শতাংশই বিস্ফোরক অস্ত্রের কারণে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গাজায় এখনো শিশুদের হামলার শিকার হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে রিকার্ডো পিরেস বলেন, একমত হওয়া যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এত শিশু নিহত। এই ধারা বিস্ময়কর। আমরা বারবার বলে আসছি, এটা কোনো পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি শিশুর একটি পরিবার ছিল, স্বপ্ন ছিল, জীবন ছিল; হঠাৎ তাতে ছেদ টানল ধারাবাহিক সহিংসতা। গাজায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শিশুরাই সবার ওপরে থাকবে; ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি হামলায় ৬৪ হাজারের বেশি শিশু হতাহত হয়েছে বলে গত মাসে ইউনিসেফ ধারণা দিয়েছিল। সেভ দ্য চিলড্রেন চলতি সপ্তাহে জানায়, ২০২৪ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৪৭৫টি ফিলিস্তিনি শিশু সারা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধী হয়েছে। যুদ্ধের কারণে এদের কেউ মস্তিষ্কে আঘাত পেয়েছে, কারও শরীর ভয়ানকভাবে দগ্ধ হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, আধুনিক ইতিহাসে অঙ্গহারা শিশুদের সবচেয়ে বড় আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে গাজা। ইসরায়েল ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে ব্যাপক অভিযোগ আছে। এর ফলে গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। খাবারের অভাবে এরই মধ্যে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সংঘাতে গত বছর ১২ হাজার শিশু হতাহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন। সংস্থাটি বলছে, ২০০৬ সালে এসব ঘটনার নথিভুক্তকরণ শুরুর পর থেকে শিশু হতাহতের সংখ্যা ২০২৪ সালেই সর্বোচ্চে পৌঁছেছে; এর ৭০ শতাংশই বিস্ফোরক অস্ত্রের কারণে। এ সংখ্যা ২০২০ সালের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে শিশু হতাহতের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে। এরপর রয়েছে সুদান, মিয়ানমার, ইউক্রেন ও সিরিয়া। বিস্ফোরণ ও মানসিক আঘাত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন। সুদানে প্রায় এক কোটি শিশু সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করছে। ২০২৩ সালে সেখানে ১ হাজার ২০০ শিশু নিহত বা আহত হয়েছিল; ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৩৯ জনে। ইউক্রেনে বিস্ফোরক অস্ত্রে আহত শিশুদের হার ৭০ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক গঠন, শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য ও আচরণগত কারণে বিস্ফোরক হামলায় শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণে আহত শিশুদের চিকিৎসা জটিল। অঙ্গচ্ছেদ বা অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ দক্ষতা ও পরিকল্পনা প্রয়োজন।