চুক্তি থেকে বাদ পড়ল জীবাশ্ম জ্বালানি প্রসঙ্গ

বিশৃঙ্খলা আর তিক্ততার পর ব্রাজিলের বেলেমে এমন এক চুক্তির মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের (কপ৩০) পর্দা নামল, যেখানে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির প্রসঙ্গে কোনো সমঝোতাই হয়নি। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সর্বসম্মতিক্রমে একটি চুক্তি হয়েছে। চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব মোকাবিলায় দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থসহায়তা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ানোর মূল চালিকাশক্তি জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে সরাসরি কোনো কিছু বলা হয়নি। তাছাড়া চুক্তিটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং স্বেচ্ছাভিত্তিক। অর্থাৎ, সম্মত কোনো দেশ চাইলে চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারবে।

তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের পুরনো অবস্থান ধরে রেখেছে; তাদের ভাষ্য, অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার করতে দেওয়া দরকার। এমন সময়ে এ সম্মেলন হলো, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য ব্যর্থ হতে চলেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সম্মেলনের চূড়ান্ত বৈঠক হয় গত শনিবার। সেখানে দেশগুলোকে বিরোধিতার সুযোগ না দেওয়ায় এ আয়োজনের সভাপতিত্ব নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন কলম্বিয়ার একজন প্রতিনিধি। দেশটির প্রতিনিধি ড্যানিয়েলা দুরান গনজালেস বিবিসিকে বলেন, বিশ্বে যে পরিমাণ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হয়, তার ৭৫ শতাংশের বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে বলে আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে এখন সেই বাস্তবতা নিয়ে কথা বলা শুরু করার সময় এসেছে।

সম্মেলনের চূড়ান্ত পর্বে ‘স্বেচ্ছাসেবার’ ভিত্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারী, জার্মানির সাবেক জলবায়ু দূত জেনিফার মরগান বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ১২ ঘণ্টার রাত্রিকালীন আলোচনায় যখন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো কঠোর অবস্থান নেয়, তার বিপরীতে কেউ না থাকলে এটা কঠিন হয়ে যায়। চূড়ান্ত বৈঠকে সৌদি আরবের একজন প্রতিনিধি বলেন, নিজস্ব বাস্তবতা ও অর্থনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক দেশেরই নিজেদের মতো পথ তৈরির সুযোগ রাখা উচিত। কিন্তু অনেক দেশ যে আলোচনা থেকে সরে যায়নি বা অতীতের জলবায়ু চুক্তি থেকে পিছুটান দেয়নি, সেটাকে ‘স্বস্তির বিষয়’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

বিবিসি লিখেছে, দুই সপ্তাহের এ সম্মেলন বিশৃঙ্খলায় ভরা ছিল। শৌচাগারের পানি শেষ হওয়া, তীব্র বজ্রঝড়ে সভাস্থল প্লাবিত হওয়া এবং প্রতিনিধিদের গরম ও আর্দ্র কক্ষের ব্যবস্থা করতে অসুবিধা হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। সম্মেলনে প্রায় অর্ধলাখ নিবন্ধিত প্রতিনিধিকে দুবার সরাতে হয়েছিল। প্রতিবাদকারী প্রায় ১৫০ জনের একটি দল নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে সভাস্থলে প্রবেশ করে; তারা ‘আমাদের বন বিক্রির জন্য নয়’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন। বৃহস্পতিবার অগ্নিকাণ্ডে ছাদে গর্ত সৃষ্টি হলে অংশগ্রহণকারীরা তাড়াহুড়া করে বাইরে চলে যান। বিবিসি জানিয়েছে, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা সম্মেলনের জন্য বেলেম শহরকে বেছে নিয়েছিলেন, যাতে বিশ্বের দৃষ্টি আমাজন বনের দিকে চলে আসে এবং শহরে আর্থিক প্রবাহ বাড়ে। দেশটির আরও উচ্চাকাক্সক্ষী জীবাশ্ম জ্বালানি চুক্তির ইচ্ছা থাকলেও ব্রাজিলের সমালোচনা রয়েছে আমাজনের মুখে তেল খননের পরিকল্পনার জন্য। গ্লোবাল উইটনেস নামের ক্যাম্পেইন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলে সামুদ্রিক তেল ও গ্যাস উৎপাদন ২০৩০-এর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাড়তে চলেছে।