মসজিদভিত্তিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা

মসজিদ মুসলমানদের জ্ঞানচর্চার সূতিকাগার। মুসলিম সমাজব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মসজিদকেন্দ্রিক পরিচালিত হয়। মহানবী (সা.) ছিলেন মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকেই সব কার্যাদি পরিচালনা করতেন। জ্ঞানচর্চায়ও মসজিদের ভূমিকা অপরিসীম। বিভিন্ন মুসলিম সভ্যতায়ও আমরা এর নিদর্শন পেয়ে থাকি। আর বাংলাদেশে এর গুরুত্ব আরও বেশি।

মসজিদভিত্তিক লাইব্রেরি : বিশ্বের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ উন্নত কোনো রাষ্ট্র নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অবহেলা এই জাতিকে পিছিয়ে রেখেছে। এক্ষেত্রে কাজ করতে হবে সচেতনভাবে। নারীদের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে ৬৪ জেলায় মসজিদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে কিছু বড় বড় মসজিদে লাইব্রেরি কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ছাড়াও রয়েছে সঠিক পরিচালনার অভাব। এত অধিকসংখ্যক মসজিদ থেকে যদি জাতি সঠিক জ্ঞানের সন্ধান পায়, তবে এই ঘাটতি কিছুটা লাঘব হবে। জাতি হিসেবে আমরাও শির উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।

লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ : বাংলাদেশে মসজিদভিত্তিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতন ও বিজ্ঞ জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটা মসজিদের পরিপার্শ্ব থেকে কিছু মানুষকে একত্র হতে হবে। এক্ষেত্রে করণীয় কিছু বিষয় উল্লেখ করা হলো।

সঠিক নিয়ত : কাজের পূর্বে সঠিক নিয়ত থাকা আবশ্যক। কাজের পূর্বে উপযুক্ত ও কার্যকর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিক করা এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করা আসল কাজের অর্ধেক। এটা না হলে কাজ হয়ে গেলেও তা একসময় ঝিমিয়ে পড়বে বা সঠিক ফলাফল দেবে না। আর মুসলিম হিসেবে আমাদের কাজের প্রতিদান তো নিয়ত হিসেবেই পেয়ে থাকব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দার সকল কাজই তার নিয়াতের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি ১) এজন্য আগেই সঠিক নিয়ত ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

পরামর্শ : মসজিদ কমিটি এবং মুসল্লিদের সঙ্গে পরামর্শ করা কাম্য। তাদের এর উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে হবে। আশা করা যায়, সঠিকভাবে উপস্থাপন ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে। পরামর্শক্রমে লাইব্রেরি পরিচালনার গঠনতন্ত্র এবং একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করতে হবে। এতে লাইব্রেরির অধীনে করা সব কাজ গোছালোভাবে অন্যদের সামনে তুলে ধরা যাবে।

লাইব্রেরি গঠন ও পরিচালনা : প্রাথমিক কাজ শেষ হলেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসবে। সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তা পরিচালনা করতে হবে। এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা উল্লেখ করা হলো।

ফান্ড কালেকশন : কাজের শুরুতে ফান্ডের দিকে মনোযোগ দিতেই হবে। ফান্ড কীভাবে সংগ্রহ করতে হবে, তা ঠিক করে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা মুসল্লিদের থেকে চাঁদা, মসজিদ ফান্ড থেকে গ্রহণ, সমাজের ধনী শ্রেণির মানুষদের থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থা থাকে যারা এগুলোতে ফান্ডিং করে থাকে, তাদের কাছে আবেদন করা। এর মধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনও রয়েছে। এভাবেই প্রাথমিক ফান্ড গঠন করা যাবে। সতর্কতা হলো, সমাজের গরিবদের কাছে বা রাস্তা আটকিয়ে এই চাঁদা কালেকশন থেকে বিরত থাকতে হবে। এটা শুরুতেই লাইব্রেরির ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করবে।

বই সংগ্রহ : ফান্ড কালেকশনের পর বই সংগ্রহের পালা। অবশ্য বই রাখা এবং পড়ার জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। কী ধরনের বা কোন ক্যাটাগরির বই সংগ্রহ করতে হবে তা স্থান, কাল, পাত্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবুও কোরআন, হাদিস, সিরাত, আধুনিক ফিকহ, ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি, আত্মউন্নয়নমূলক, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, শিশুতোষ ইত্যাদি ক্যাটাগরির বই রাখা যাবে।

কার্যকর প্রচারণা : প্রচারণা বা দাওয়াতি কাজ আঞ্জাম দিতে হবে। অনলাইন, স্থানীয় গণমাধ্যম, মসজিদের খুতবা, স্থানীয় বাজার, বিভিন্ন জায়গায় চিঠি প্রদান, পোস্টারিং ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচারণা করতে হবে। সঠিকভাবে প্রচারণা করতে পারলে পাঠক ও দাতা উভয়ই বাড়বে।

মনোরম পড়ার স্থান : বই পড়ার জন্য উপযুক্ত জায়গারও প্রয়োজন হয়। মসজিদ আঙিনায় আলাদা জায়গার ব্যবস্থা হলে ভালোই হয়। সেখানে চেয়ার-টেবিলেরও ব্যবস্থা করা যাবে। তবে এটা না হলে মসজিদ ফ্লোরেই যথেষ্ট।

বই বিতরণের ব্যবস্থা : অনেকের জন্য মসজিদে বসে পড়ার সময় বা সুযোগ নাও হতে পারে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে বই বাসায় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। লাইব্রেরির গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার নিয়মও রাখা যেতে পারে। তাহলে সদস্যদের মধ্যে বই বিতরণ বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।

যথাসময়ে বই ফেরত : এই ব্যবস্থাতে কিছু কড়াকড়ি জরুরি। বই নিয়ে ফেরত না দেওয়া বা দিতে গড়িমসি করা অনেক মানুষের স্বভাব। যদি বই সময়মতো ফেরত না আসে তবে লাইব্রেরি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্রে একটা নিয়ম রাখা যেতে পারে যে, বই ফেরত দিতে দেরি হলে পাঁচ কিংবা দশ টাকা লাইব্রেরি ফান্ডে জরিমানাস্বরূপ দিতে হবে।

লাইব্রেরিকেন্দ্রিক সৃজনশীল উদ্যোগ : লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার পর এর অধীনে আরও এমন কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে মানুষ বেশি বেশি লাইব্রেরিমুখী হয়। যেমন নির্ধারিত বই পাঠ প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা। এটা শিশু-কিশোর, যুবক, নারী, বয়স্ক সব ক্যাটাগরিতে আলাদাভাবে আয়োজন করা যায়। এর মাধ্যমে খুব ভালো সাড়া পড়বে। এ ছাড়াও নির্ধারিত বইয়ের ওপর মাসিক আলোচনা চক্র করা যেতে পারে।

সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য জাতিকে বইমুখী করার বিকল্প নেই। আর এজন্য মসজিদভিত্তিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ হতে পারে সমাজ পরিবর্তন ও সংস্কারের হাতিয়ার।

লেখক : শিক্ষার্থী, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া