বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর আগামী ২২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো হতে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন। সারা ক্যাম্পাসে এ উপলক্ষে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে; আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও বাড়ছে প্রতিদিন।
নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্যানেল ঘোষণার সময় মাইকের ব্যবহার, প্রচারে শোডাউন করাসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে, যেমন নিয়ম ভাঙার উৎসব চললেও কমিশন দেখেও দেখছে না, ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ঢিলেমির লক্ষণ রয়েছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্য দিয়েই প্যানেল ঘোষণা করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তি। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থী বা তার পক্ষের কেউ লাউডস্পিকার বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করতে পারবে না। কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শুধু হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করা যাবে। মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) দুপুরে এ বিধি ভঙ্গ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এবং জাতীয় ছাত্রশক্তি শাখা; প্যানেল ঘোষণার সময় তারা মাইক ব্যবহার করেছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। কমিশনের কাছে মৌখিক অভিযোগ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত কনসার্টে অনুদান দিয়েছেন ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা এবং সাহিত্য ও
সংস্কৃতি সম্পাদক প্রার্থী তাকরিম আহমেদ। গত রবিবার সন্ধায় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত কনসার্টে আচরণবিধি লঙ্ঘনের এ ঘটনা ঘটে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, খাদিজাতুল কুবরা কনসার্টের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদপ্রার্থী তাকরিম আহমেদ ছাত্রদলের পক্ষ হয়ে ৩০ হাজার টাকা অনুদানের ঘোষণা দেন। তখন উপস্থিত ছিলেন জবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ও সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন। ক্যানসার আক্রান্ত ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী মীর নূর নবীর চিকিৎসার জন্য এ চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন করা হয়।
খাদিজাতুল কুবরার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর তিনি ছাত্রী হলের বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে স্যানিটারি প্যাড, মগ বিতরণ করে নিজের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন। অথচ জকসু নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় বলা আছে, ‘মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরুর আগের দিন থেকে নির্বাচনের ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’
আচরণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, ‘একজন প্রার্থী হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে পারবেন। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে নির্ধারিত টাকার অতিরিক্ত আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রার্থিতা বাতিল বলে গণ্য হবে।’
‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থীর বিরুদ্ধেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ভূমিকম্পে আতঙ্কের কারণে সাতদিন জবি ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হলে শিক্ষার্থীদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করে দেন ভিপি প্রার্থী এ কে এম রাকিব। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পরিচালক ড. তারেক বিন আতিক তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘এই প্রচেষ্টার জন্য অকগ জধশরন ও গউ অৎরভঁষ ওংষধস গড়যধসসধফ অহহধহ-কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, সর্বপ্রথম তোমরাই পরিবহন প্রশাসকের অফিসে এসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে গাড়ি দেওয়ার অনুরোধ করেছিলে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পরিচালক তার ফেসবুক পোস্টে একটি প্যানেলের ভিপির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার এ বক্তব্য জকসুর নির্বাচনী আচরণবিধির ৬ (ঙ) ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
তাছাড়া, গত সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভাগীয় শহরের উদ্দেশে বাস ছাড়ার আগে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করছেন এ কে এম রাকিবসহ ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল। এ কাজও আচরণবিধির ১১(ঙ) ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
জকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানের বিরুদ্ধেও নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী উম্মে মাবুদার ফেসবুক পোস্টের কমেন্ট সেকশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার লিখেন, ‘সমাজকর্ম পরিবারের পক্ষ থেকে শুভকামনা।’ জকসু নির্বাচনের আচরণবিধির ৬ (ঙ)-তে বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নির্বাচনী প্রচারণায় কোনোরকমে অংশগ্রহণ বা প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন না।’
ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান প্যানেলের ভিপি প্রার্থী এ কে এম রাকিব বলেন, ‘আমরা এক ধরনের অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এ সংকটে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসছেন, এটাই আমাদের সম্মিলিত শক্তি। আশা করি, নির্বাচন কমিশন বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।’
ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান প্যানেলের জিএস প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা বলেন, ‘আমি প্রার্থী হিসেবে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কনসার্টে উপস্থিত হয়েছি। আর ৫০ হাজার টাকা আমি নিজের থেকে দেইনি। আমার ফান্ড রেইজ করার সুযোগ ছিল, তাই আমি ফান্ড রেইজ করে দিয়েছি।’
সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদপ্রার্থী তাকরিম আহমেদ বলেন, ‘আমি প্রার্থী হিসেবে নয়, একজন কো অর্গানাইজার হিসেবে কনসার্টে গিয়েছি। ছাত্রদলের অনুদানের পরিমাণটা আমি ঘোষণা দিয়েছি মাত্র।’
পরিবহন পরিচালক ড. তারেক বিন আতিক বলেন, ‘হ্যাঁ এ বিষয়ে আমি একটা কমেন্ট করেছিলাম। এটি আসলে নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো বিষয় ছিল না। নির্বাচনের প্রচারণার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র নেই।’
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান। তিনি বলেন, ‘অভিযোগগুলো শুনেছি, ডকুমেন্টসও পেয়েছি। আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলে কীভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে সে বিষয়েও আইন আছে। চার বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন হয়েছে। সবখানেই অভিযোগ উঠেছে। তারা অভিযোগ কীভাবে হ্যান্ডেল করেছে আমরা তার খোঁজখবর নিচ্ছি। অনেক সংগঠনই প্রোগ্রাম করতে চেয়েছিল, সবাই শিক্ষার্থীদের বাড়ি পৌঁছে দিতে বাস চেয়েছিল; আমি নিষেধ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেব এই অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এসব স্পষ্টতই আচরণবিধির লঙ্ঘন।’ তার বিষয়ে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘শুভকামনা জানানো আচরণবিধির লঙ্ঘন নয়। আমি একজন শিক্ষক। সে আমার সরাসরি শিক্ষার্থী; আমি শুধু তাকে নয় যে কাউকেই শুভকামনা জানাতে পারি।’