বিয়েবাড়িতে মাইকে গান সালিশ ডেকে বেত্রাঘাত

বিয়ের অনুষ্ঠানে মাইকে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জেরে সালিশ বসিয়ে কনের পরিবারের সদস্যদের বেত্রাঘাত করার অভিযোগ ওঠেছে। ওই সালিসে কনের পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। স্থানীয় যুবদল নেতা আফছার উদ্দিন ওই সালিশ ডাকেন। উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. তছলিম উদ্দিন ও স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন মাঝি এ সালিশ পরিচালনা করেন। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারাও এতে অংশ নেন।

ঘটনাটি ঘটে গত ২০ অক্টোবর নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের শাহজাহানের বাড়িতে। সেদিন তার এক মেয়ের বিয়ে হয়। সালিশে ধার্য জরিমানা পরিশোধ না করায় সেদিন শাহজাহানের আরেক মেয়ে জামাইয়ের অটোরিকশা আটক করা হয়। অটোরিকশাটি আটকে রাখার সূত্রে গতকাল বৃহস্পতিবার বিষয়টি জানাজানি হয়।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। মাইক বাজানোর জন্য এভাবে একটি পরিবারকে নির্যাতন করা এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তারা বলছেন, এই ধরনের বিচার বা সালিশ সম্পূর্ণরূপে বেআইনি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শুধু প্রতিষ্ঠিত আদালতই ফৌজদারি অপরাধের বিচার ও শাস্তি দিতে পারে। গ্রাম আদালতে বেত্রাঘাতের মতো শারীরিক শাস্তি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। এই ঘটনা শুধু ব্যক্তি স্বাধীনতার লঙ্ঘন নয়, এটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। অপরাধীরা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে এই ধরনের বর্বরতা চালায়।

অবশ্য আবাসিক এলাকায় উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে এক ধরনের অপরাধ। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীনে ২০০৬ সালে যে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়, সেই বিধিমালার ৯ ধারায় উচ্চৈঃস্বরে গান বাজানোসহ বিভিন্ন ধরনের শব্দদূষণের বিষয়ে বলা আছে। বিধিমালায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি না পেয়ে আবাসিক এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবল ও রাতের বেলায় ৪৫ ডেসিবলের বেশি শব্দ অতিক্রম করতে পারবে না। তবে কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে খোলা বা আংশিক খোলা জায়গায় বিয়ে বা অন্য কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে গান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের সভা, মেলা, যাত্রাগানের অনুষ্ঠান করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে অনুষ্ঠান আয়োজনকারী ব্যক্তিকে পুলিশ কমিশনার বা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে হবে। সে আবেদন মঞ্জুর হলে দৈনিক ৫ ঘণ্টা শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্র বাজানো যাবে এবং রাত ১০টার পরে তা আর বাজানো যাবে না। এ আইনের ১৮ ধারায় বলা আছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবাসিক এলাকায় শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্র বাজালে বা আইন অমান্য করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং এক মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া পরে একই ধরনের অপরাধ করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৬ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

অবশ্য এ জরিমানা করার এখতিয়ার কেবল স্বীকৃত আদালতেরই আছে। গ্রাম আদালত, সালিশে কোনো সাজা দেওয়াটা বেআইনি। সালিশ আইন ২০০১ অনুসারে, সালিশিব্যবস্থা একটি সম্পূর্ণ সামাজিক প্রক্রিয়া। এ ব্যবস্থায় একজন নিরপেক্ষ তৃতীয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ বিবাদরত দলের সঙ্গে সামনাসামনি ও খোলাখুলিভাবে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে সমঝোতায় পৌঁছাতে সাহায্য করে থাকেন। এক্ষেত্রে সালিশি ব্যক্তি কোনো বিচারক নন এবং তিনি কোনো আইন প্রয়োগও করেন না। আইন অনুযায়ী, সালিশি ব্যবস্থায় কাউকে কোনোরূপ শাস্তি দেওয়া যাবে না বা দোষী করা যাবে না। বিশ্বাস ভঙ্গ করা যাবে না। এমনকি এরূপ প্রতিশ্রুতি করা যাবে না যা কখনো কার্যকর করা সম্ভব নয়।

ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় সাগরিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফরহাদ হোসেন বলেন, বিয়েতে মাইক বাজানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। উভয় পক্ষকে আইনের আশ্রয় নিতে বলেছি। তবে তারা আমার কথা না শুনে সালিশের আয়োজন করে। আমি আর সেখানে থাকিনি। এরপর আমার আর কিছু জানা নেই।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ২০ অক্টোবর শাহজাহানের এক মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। সে অনুষ্ঠানে আগের রাতে মাইকে গান বাজায় তারা। ওইদিন রাতেই স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আফসার উদ্দিন কেন গান বাজানো হয়েছে, সে কৈফিয়ত চান। এ নিয়ে শাহজাহানের ছেলের সঙ্গে কথা কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। এ ঘটনার পরের দিন রাতে শাহজাহানের বাড়িতেই সালিশ বসে। সালিশে গান বাজানোর কারণে শাহজাহান, তার স্ত্রী ও ছেলেকে বেত্রাঘাত করা হয়।

শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ, আমার মেয়ের বিয়েতে শখ করে মাইক বাজিয়েছি। এ জন্য স্থানীয় আফসার, ছারোয়ার ও মালেক আমাদের পরিবারের সবাইকে মারধর করেছে। তারা আবার আমাদের জন্য সালিশ বাসায়। আলাউদ্দিন মাঝি, তছলিম, আনোয়ার মাঝি, সেন্টু ও রফিকসহ কয়েকজন সালিশদার আমাদের সবাইকে মাথাপিছু ১৫ বেতের রায় করে। আমি এবং পরিবারের সবাই বার বার ক্ষমা চাওয়ার পরও তারা কর্ণপাত করেননি। সবাইকে বেত দেওয়ার পর তারা ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা জোগাড় করতে না পারায় আফছার আমার মেয়ের জামাইর অটোরিকশা নিয়ে যায়।’

সালিশে উপস্থিত থাকা একজন সালিশদার বলেন, মাইক বাজানোর বিষয়ে আফসারকে জিজ্ঞাসা করার কারণে হট্টগোল বাধে। ওখানে আফসারের ৫০ হাজার টাকা হারিয়ে যায়। আমরা তার সঠিক প্রমাণ পাইনি। তবুও আমাদের মধ্যে একজন সালিশদার এই টাকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ হাজার টাকা জরিমানার রায় দিয়েছেন। সালিশে মহিলাদের বাদ দিয়ে, পুরুষদেরকে বেত দেওয়া হয়। মহিলাদের বেত দেওয়ার জন্য ঘরের মুরব্বি শাহজাহানকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনিই বেত দেন।

তবে যুবদল নেতা আফসার উদ্দিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি একাধিক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ঘটনার রাতে জেলা শহরের সোনাপুর থেকে জেলেদের মাছ বিক্রির টাকা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। তখন বাড়ির সামনে কনের ভাইকে দাঁড়ানো দেখে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। পরে কনের পরিবারের লোকজন তার ওপর হামলা করেন। এ সময় তার ৫০ হাজার টাকা হারিয়ে যায়। তবে সালিশের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বিষয়টি দলীয় লোকজন জানার পর রাতে সালিশ হয়। ওই সালিশে বেত্রাঘাতের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

হাতিয়া থানার ওসি এ কে এম আজমল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন. বিষয়টি শুনেছি। তবে এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।