ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’র প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় প্রবল বৃষ্টি হলেও জলীয় বাষ্পপূর্ণ মেঘ পেয়েছে বাংলাদেশ। আর এই মেঘের প্রভাবে দিনভর সূর্যের আলো দেখা যায়নি দেশ জুড়ে। এতে শীত জেঁকে বসেছে মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে মেঘ কেটে যাওয়ার পর বাড়বে দিনের তাপমাত্রা এবং ধীরলয়ে কমবে রাতের তাপমাত্রা।
দিনভর সূর্যের আলো না পাওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবহাওয়াবিদ ও সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সকালে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছলাম। কিন্তু পথিমধ্যে কোথাও সূর্যের আলো পেলাম না। দুপুর দুইটার আগমুহূর্তে যশোর এলাকায় অল্প কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের আলো দেখার পরপরই তা মিলিয়ে যায়। আর সূর্যের আলো না থাকায় দিনভর শীত অনুভব হয়েছে।’
মোহন কুমার দাশের এই বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় আবহাওয়ার উপাত্তেও। গতকাল ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ২৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু এর আগের দিন তথা সোমবার ছিল ২৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ঢাকায় একধাপে নেমে গিয়েছে। এই চিত্র শুধু ঢাকা নয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং বিভাগের কর্মকর্তা কাজী জেবুন নেসা বলেন, টাঙ্গাইলে গত সোমবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ২৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, গতকাল তা নেমে অসে ২৭ ডিগ্রিতে। ফরিদপুরে গত সোমবার রেকর্ড হওয়া ২৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে গতকাল ২৭ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে।
তাপমাত্রা কমার এই চিত্র কি সারা দেশে? এই প্রশ্নের জবাবে কাজী জেবুন নেসা বলেন, প্রায় সারা দেশেই এক থেকে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস করে তাপমাত্রা কমেছে।
দিনের তাপমাত্রা কমছে কেন?
দেশের আবহাওয়ারে পঞ্জিকা অনুযায়ী ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস শীতকাল। সে হিসেবে রাতের তাপমাত্রা (সর্বনিম্ন তাপমাত্রা) বেশি কমার কথা। কিন্তু হঠাৎ করে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে গেল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’ এর প্রভাবে আমাদের দেশের ঊর্ধ্বাকাশে মেঘের একটি স্তর জমেছে। এই মেঘের কারণে গত দুই দিন সূর্যের আলো সঠিকভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। গত সোমবার সূর্যের আলো কিছুটা পাওয়া গেলেও গতকাল মঙ্গলবার সারা দেশে সূর্য প্রায় দেখাই যায়নি। এ জন্য দিনের তাপমাত্রা বাড়তে পারেনি এবং শীত অনুভব হয়েছে। তবে রাতে কিন্তু তাপমাত্রা তেমন কমবে না। মেঘের কারণে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রার বিকিরণ হয়নি বলে তা জমা রয়েছে এবং রাতে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বিরাজ করবে। ফলে রাতে বেশি শীত অনুূভব হবে না।
রাতের তাপমাত্রা কমবে কখন?
দিনের তাপমাত্রা আজ বুধবারের পর থেকে বাড়তে থাকবে বলে দিনে শীতের অনুভব কমে আসবে বলে জানান আবহাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করা আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ। তিনি বলেন, গতকালের পর আকাশের মেঘ কেটে যাবে। আর মেঘ কেটে গেলে সূর্যের আলো প্রবেশে কোনো বাধা থাকবে না এবং দিন শেষে তা বায়ুম-লে ফেরতও চলে যাবে বিকিরণ প্রক্রিয়ায়। আর তাই বৃহস্পতিবার থেকে ধীরে ধীরে রাতের তাপমাত্রা কমবে।
রাতের তাপমাত্রা কমলে কি শীতের তীব্রতা বাড়বে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শীতকালে শীত তো হবেই। তবে তীব্র শীত যাকে বলে শৈত্যপ্রবাহ, তা চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে দেখা পাওয়া যেতে পারে। এর আগে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে আবহাওয়ার উপাত্তে দেখা যায়, গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে তেঁতুলিয়ায় ১১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রংপুরের রাজারহাটে ১২, দিনাজপুরে ১৩, সৈয়দপুরে ১৩ দশমিক ৫, রংপুরে ১৪, রাজশাহীতে ১৪ দশমিক ৫, রাঙ্গামাটিতে ১৬, কুমিল্লায় ১৭, চট্টগ্রামে ১৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ অক্টোবর মৌসুমি বায়ু বিদায়ের পরের দুই মাসকে ধরা হয় ঘূর্ণিঝড়ের ভরা মৌসুম। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরে গত ২৫ অক্টোবর সৃষ্টি হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় ‘মন্থা’ , যা ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ উপকূল দিয়ে অতিক্রম করেছিল। পরে গত সপ্তাহে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’ গত শনিবার শ্রীলঙ্কা হয়ে ভারতের চেন্নাই উপকূলে স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। এর প্রভাবে শ্রীলঙ্কা ও ভারতের চেন্নাই উপকূলীয় এলাকায় প্রবল বৃষ্টি হয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়টি এখন কেটে যাওয়ায় এখন শীতের প্রভাব বাড়তে পারে। সাধারণত কোনো অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন ওই এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। আর যদি তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন ওই এলাকায় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে চলতি মাসের শেষার্ধে একাধিক মৃদু বা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে বলা হয়েছে।