গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হয়েও অপারগতা প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ উপস্থিত হয়ে তিনি অপারগতা প্রকাশ করে ক্ষমা চান। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে তিনি যেন আর নেতিবাচক কোনো মন্তব্য না করেন সে বিষয়ে তাকে সতর্ক করে ট্রাইব্যুনাল। এর আগে ২৩ নভেম্বর এ মামলার শুনানির দিন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে শেখ হাসিনার পক্ষে শুনানির আগ্রহ প্রকাশ করেন জেড আই খান পান্না। পরে তাকে এ মামলায় রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করে আদালত। যদিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার পক্ষে শুনানি করবেন না বলে জানান জেড আই খান পান্না।
গতকাল দুপরে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন বিচারকের বেঞ্চে গুমের অভিযোগে ১০ সেনা কর্মকর্তার মামলায় অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি শুরু হয়। তবে এ সময় জেড আই খান পান্না আদালতে উপস্থিত না থাকায় উষ্মা প্রকাশ করে তাকে ফোন করে বা লোক পাঠিয়ে আসতে বলে আদালত। কিছুক্ষণের মধ্যে হুইলচেয়ারে করে ট্রাইব্যুনালে আসেন জেড আই খান পান্না।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পান্নাকে বলেন, ‘আপনি শেখ হাসিনার পক্ষে শুনানির অনুমতি পেয়েছেন। কিন্তু আসেননি। আপনার অনুপস্থিতিতে শুনানি করতে হয়েছে।’
পান্না বলেন, ‘এ মামলায় না দাঁড়ানোর জন্য আমি রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে (ট্রাইব্যুনালের) চিঠি পাঠিয়েছি।’
ট্রাইব্যুনাল বলে, ‘রেজিস্ট্রার কার্যালয় তো অথরিটি না। আপনাকে নিযুক্ত করেছি আমরা।’
ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, ‘আপনি ট্রাইব্যুনালকে নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। আপনি ট্রাইব্যুনাল মানেন না। এটা ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না। এটা কি আপনি বলতে পারেন?’
জেড আই খান পান্না বলেন, ‘যেখানে আমার ক্লায়েন্টে আস্থা নেই সেখানে আমি কীভাবে আসি।’
ট্রাইব্যুনাল বলে, ‘আমরা আপনার ইন্টারেস্ট অনুযায়ী দিয়েছি। আপনার ক্লায়েন্ট হাজির হবেন না; আপনিও আসবেন না। আপনার আসামি পলাতক। আমরা কি তাকে ধরে আনতে পারব। আপনি শুনানি না করতে চাইলে ট্রাইব্যুনালে এসে বলতে হবে।’
জেড আই খান পান্না বলেন, ‘আমি আনকন্ডিশনাল অ্যাপোলজি (নিঃশর্ত) চাই।’
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে আমরা আশা করব আপনি সহযোগিতা করবেন। আপনি এসে বলতে পারেন না এটা হবে না, ওইটা হবে না। ঠিক আছে, আপনি আসবেন না, আমরা অ্যাডভোকেট আমির হোসেনকে নিয়োগ করব।’
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান আমির হোসেনকে প্রশ্ন করেন তিনি শেখ হাসিনার পক্ষে শুনানি করবেন কি না।
জবাবে আমির হোসেন বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল যদি মনে করে তাহলে আমি শুনানি করব।’
একপর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘উনি (জেড আই খান পান্না) ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে যা বলেছেন সেটা নোট রাখা দরকার। উনি নিজ থেকে মামলা করতে চান আবার বলছেন চান না। শেখ হাসিনা যেহেতু এই ট্রাইব্যুনাল মানেন না, উনিও তা বলছেন। এটা তো ট্রাইব্যুনালকে যা তা মনে করা।’
ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আপনাদের (জেড আই খান পান্না) আইডল মনে করি। ২৪-এর অভ্যুত্থানের সময় আপনার ভূমিকা আছে। কিন্তু এটা তো কোর্ট। এখন কোর্টকে যদি এমন কথা বলেন তাহলে কি আমরা ধরে নেব ওনার (শেখ হাসিনা) সঙ্গে আপনার পারসোনাল যোগাযোগ আছে। আপনি এটা বলতে পারেন না। আদালত থেকে কি আপনার ক্লায়েন্ট বড়?’
জেড আই খান পান্না বলেন, ‘না, বড় নয়।’ একপর্যায়ে জেড আই খান পান্না চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু একটা বলতে চাইলে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ। যা খুশি তা বলা যাবে না।’
জেড আই খান পান্না বলেন, ‘যা খুশি তা তো আমি বলিনি।’
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আরেকজন ল’ ইয়ার বলেছেন, কোর্ট মানেন না। আপনারা সংবিধান মানবেন না, আইন মানবেন না। তাহলে কোন দেশের আইন মানবেন। সবকিছু সংবিধানের মধ্যে থেকে হবে তো।’
এ সময় জেড আই খান পান্না প্রশ্ন করেন, ‘কোন সংবিধান? বাহাত্তরের সংবিধান?’
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধান।’
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান জেড আই খান পান্নার উদ্দেশে বলেন, ‘সংবিধান কয়টা?’
জবাবে পান্না বলেন, একটা।
ট্রাইব্যুনাল বলে, ‘সংবিধানে বলা আছে, আইন মেনে নিতে হবে। আমরা আইন মানি না এটা বলতে পারি না।’
পান্না বলেন, ‘আমি বাহাত্তরের সংবিধান বলে কি ভুল করেছি?’
বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের সংবিধান তো একটাই।’
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনি যা বলবেন তা মানুষ দেখবে। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে এ ধরনের কথা আর বলবেন না। মানুষকে বিভ্রান্ত করা আপনাদের কাজ নয়।’
ট্রাইব্যুনালে ক্ষমা চেয়েছেন অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান : আদালত অবমাননার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা (বর্তমানে পদ স্থগিত) অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ফজলুর রহমান আদালতের কাছে ‘আনকন্ডিশনাল অ্যাপোলজি’ (নিঃশর্ত ক্ষমা) প্রার্থনা করেছেন। তিনি একটা পিটিশন জমা দিয়েছেন। বলেছেন, যা কিছু তিনি বলেছেন, সেটা ভুলে বলেছেন এবং আদালতের কাছে ‘মার্সি’ (ক্ষমা) চান।
এর আগে গত রবিবার ফজলুর রহমানকে তলব করে ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে ৮ ডিসেম্বর তাকে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওইদিন ফজলুর রহমানকে তার শিক্ষা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ নিয়ে সশরীরে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। গত ২৬ নভেম্বর ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়, সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে ফজলুর রহমান বলেছেন তিনি এই ট্রাইব্যুনাল মানেন না। তিনি আরও বলেছেন, এই ট্রাইব্যুনাল তৈরি হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য। তাই এই ট্রাইব্যুনালে অন্য কোনো বিচার ও রায় হতে পারে না বলে টকশোতে তিনি (ফজলুর রহমান) মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে গত ২৬ আগস্ট ফজলুর রহমানের প্রাথমিক সদস্যসহ তার পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে বিএনপি। তবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৩ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে ২৩৭ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন তাতে কিশোরগঞ্জ- ৪ আসনে ফজলুর রহমানের নাম রয়েছে। ফজলুর রহমান ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। কয়েকবছর তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের রাজনীতিতে জড়িত হন।