বেগম রোকেয়া দিবস আজ

আজ ৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ১৪৫তম জন্ম ও ৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৮০ সালের এই দিনে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মহীয়সী এই নারী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে নারীর শিক্ষা, অধিকার ও মুক্তির আন্দোলনে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে পায়রাবন্দ থেকেই তিনি সংগ্রাম শুরু করেছিলেন।

দিবসটি উপলক্ষে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘নারীমুক্তি ও মানবাধিকার নিয়ে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।’ তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের নারী সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে বেগম রোকেয়ার অসামান্য অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আজ বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আমি এই মহীয়সী নারীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া নারীদের ভাগ্যোন্নয়নের মূল চাবিকাঠি শিক্ষা। এ উপলব্ধি থেকে বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তারে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। বেগম রোকেয়া নারী উন্নয়নের পথে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।’

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বাণীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘বেগম রোকেয়া নারী জাগরণের একজন আলোক দিশারি। মূলত বেগম রোকেয়ার উচ্চারণের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে নারীর সঠিক স্বাধীনতা। তার কর্মময় জীবন ও আদর্শ নারী সমাজকে আরও উদ্যমী ও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমার বিশ্বাস।’

বেগম রোকেয়া পদক পাচ্ছেন যারা : নারীশিক্ষা, নারী অধিকার, মানবাধিকার ও নারী জাগরণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার চার নারীকে রোকেয়া পদক ২০২৫ দেওয়া হচ্ছে। পদকপ্রাপ্তরা হলেন, নারীশিক্ষা শ্রেণিতে (গবেষণা) রুভানা রাকিব, নারী অধিকার শ্রেণিতে (শ্রম অধিকার) কল্পনা আক্তার, মানবাধিকার শ্রেণিতে নাবিলা ইদ্রিস ও নারী জাগরণ শ্রেণিতে (ক্রীড়া) ঋতুপর্ণা চাকমা। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চারজনের হাতে রোকেয়া পদক তুলে দেওয়া হবে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ।

দিবসটি উপলক্ষে পায়রাবন্দে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হলেও রোকেয়ার জন্মভূমি আজও অবহেলা আর বঞ্চনায় জর্জরিত। তার নিজের গ্রামেই নারীর শিক্ষা ও স্বাধীনতার স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পায়রাবন্দে এখনো বাল্যবিবাহের হার উদ্বেগজনক। মাধ্যমিকের গ-ি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ে প্রায় ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং উচ্চমাধ্যমিকে পৌঁছানোর আগেই এই হার দাঁড়ায় প্রায় ৩০ শতাংশে।

তবে আশার কথা হলো, দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থায় থাকা বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। বাংলা একাডেমির সহযোগিতায় কেন্দ্রটি পুনরায় গবেষণা ও অধ্যয়নের জন্য খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কেন্দ্রটিতে ফের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে দিবসটি এলেই নতুন করে জোরালো হয় বেগম রোকেয়ার দেহাবশেষ ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি। ১৯৩২ সালে মৃত্যুর পর তাকে কলকাতার সোদপুর পানিহাটিতে দাফন করা হয়। ২০০৯ সালে রোকেয়ার ভাতিজি রনজিনা সাবের ফুপুর দেহাবশেষ পায়রাবন্দে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তৎকালীন জেলা প্রশাসকও এতে সমর্থন দিয়েছিলেন। এরপর ২০১০ সালে এ বিষয়ে আবেদন পাঠানো হলেও গত এক যুগেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বেগম রোকেয়ার ভাতিজি রনজিনা সাবের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রোকেয়ার স্মৃতিবিজড়িত সবকিছু পায়রাবন্দে, অথচ তিনি পড়ে আছেন কলকাতার মাটিতে। বছর বছর শুধু আলোচনা হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।’

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে স্মৃতিকেন্দ্রের কার্যক্রম যেমন নতুনভাবে শুরু হচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দ্রুতই মহীয়সী এই নারীর দেহাবশেষ তার জন্মমাটিতে ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক দাবিও বাস্তবায়িত হবে।