দুর্নীতির প্রতি মানুষ যত আকৃষ্ট হয়, ন্যায় ও সততার ভিত্তি ততই নড়বড়ে হয়ে যায়। রাষ্ট্রের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের আস্থায় চিড় ধরে। ব্যক্তিগত লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ অপরাধ কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। বিস্তৃত হয় পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রব্যবস্থায়। ইসলামের দৃষ্টিতে দুর্নীতি শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, বরং এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনের একটি ভয়াবহ রূপ। অন্যের অধিকার হরণ, অন্যায় সুবিধা গ্রহণ, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ কিংবা অবৈধ পথে সম্পদ আহরণ, সবই মানুষের ইমান, বিবেক ও ন্যায়বোধকে গ্রাস করে। কোরআন ও হাদিসে এসব আচরণের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে, আছে কঠোর শাস্তির ঘোষণা।
ইসলামের দৃষ্টিতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ, জুয়া তথা যেকোনো হারাম পন্থা অবলম্বনে উপার্জন, ক্ষমতা ও পেশিশক্তির অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, প্রতারণা, আইনের অসৎ ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল এবং দেশ, জাতি ও সাধারণ নাগরিকের অধিকার ও স্বার্থ হরণ করার নাম দুর্নীতি।
ইসলাম অপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তি দ্রুত কার্যকর করার কথা বলেছে। এ ছাড়া ইসলামে অপরাধ ও দণ্ডবিধি মওকুফ করার অধিকার রাষ্ট্রপ্রধানকেও দেওয়া হয়নি। কারণ এতে পারিবারিক পরিকল্পনা নিতে হবে। কারণ একজন শিশুর ওপর পরিবারের প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই প্রত্যেক মা-বাবার উচিত, সন্তানকে সৎ, আল্লাহভীরু ও ইসলামি অনুশাসনের পূর্ণ অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলার সুব্যবস্থা করা।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তা হচ্ছে সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির জন্য ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। দুর্নীতিমুক্ত জাতি গঠনের লক্ষ্যে ইসলামি মূল্যবোধ ও তাকওয়ার ব্যাপক অনুশীলন হওয়া প্রয়োজন। ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনে দুর্নীতির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘লোকালয়ের মানুষগুলো যদি ইমান আনত এবং তাকওয়ার জীবন অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান-জমিনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম।’ (সুরা আরাফ ৯৬)
পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। কোথাও দুর্নীতি হতে দেখলে সাধ্যমতো প্রতিবাদ করতে হবে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন সম্ভব হলে তা হাত দিয়ে রুখে দেয়। আর তা সম্ভব না হলে প্রতিবাদী ভাষা দিয়ে যেন তা প্রতিহত করে। আর তাও না পারলে সে যেন ওই অপকর্মকে হৃদয় দিয়ে বন্ধ করার পরিকল্পনা করে (মনে মনে ঘৃণা করে), এটি দুর্বল ইমানের পরিচায়ক।’ (তিরমিজি)
দুর্নীতি মানবচরিত্রেরই একটি বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীতে মানবজাতির যাত্রা যখন শুরু হয়েছিল, ঠিক তখন থেকেই দুর্নীতির গোড়াপত্তন। হজরত আদম ও হাওয়া (আ.)-এর এক সন্তান দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হাবিল ও কাবিলের ঘটনা সে কথাই প্রমাণ করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি তাদের কাছে আদমের দুই পুত্রের ঘটনা যথাযথভাবে পাঠ করো। যখন তারা উভয়ে কিছু কোরবানি পেশ করেছিল। তখন তাদের একজনের কোরবানি গৃহীত হয়েছিল আর অন্যজনেরটা গৃহীত হয়নি। সুতরাং (যার কোরবানি গৃহীত হয়নি) সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। সে বলল, নিশ্চয়ই আল্লাহ খোদাভীরুদের থেকেই (কোরবানি) গ্রহণ করে থাকেন। তুমি যদি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে তোমার হাত বাড়িয়ে দাও, তবে আমি কিন্তু তোমাকে হত্যা করতে তোমার প্রতি আমার হস্ত প্রসারিত করব না। কেন না আমি সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই, তুমি আমার ও তোমার পাপ নিজেই একা মাথায় চাপিয়ে নাও, অতঃপর তুমি জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।’ (সুরা মায়েদা ২৭-২৯)
উল্লিখিত আয়াতের প্রতি অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকালে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা যায়। এখানে দুর্নীতির কারণ, পরিণতি এবং দুর্নীতিবিরোধীদের অবস্থা স্পষ্ট বিবৃত হয়েছে। এখানে মোটা দাগে কয়েকটি বিষয় বলা যায়। এক. দুর্নীতির কারণ একটাই, আর তা হলো স্বার্থপরতা। দুই. দুর্নীতির পরিণতি, নিজের ও মজলুম জনতার সব পাপের বোঝা কাঁধে নিয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করা। তিন. শান্তিকামী মানুষের অবস্থা হলো, তাকওয়া বা খোদাভীতি নিয়ে অন্যায়-অবিচার আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া। পৃথিবীতে দুর্নীতির প্রথম প্রকাশ হজরত আদম (আ.)-এর এক পুত্রের থেকে এবং আপন সহোদরকে হত্যার মধ্য দিয়ে। আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও করেছিলেন হজরত আদম (আ.)-এর অপর পুত্র। নিজের জীবন দিয়ে তিনি শান্তিকামীদের মহৎ অবস্থান নির্দেশ করে গেছেন।
পৃথিবীর আদিতে দুর্নীতির রাহুগ্রাসে পতিত হওয়া মানবসভ্যতা এ থেকে মুক্ত হতে পারেনি আজও। তবে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রচেষ্টা চলে আসছে সেই আদিকাল থেকে। আদিতে যেমন নীতির শান্ত-শালীন অবস্থানকে টপকে দুর্নীতির অশান্ত-অশালীন আস্ফালনটা বড় হয়ে উঠেছিল, আজও সেই একই অবস্থা বিরাজমান। সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির প্রকৃতি ও ধরনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দুর্নীতিরোধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
লেখক : খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক