জবানবন্দিতে হাসনাত আব্দুল্লাহ

আন্দোলন দমনে ক্রেডিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তার ও তার সহযোগীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্র্তৃক চালানো নির্যাতন, অপহরণ ও মানসিক নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। মামলায় ২৩তম সাক্ষী তিনি।

হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, আন্দোলন দমনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে ‘ক্রেডিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা’ চলছিল। তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১৭ জুলাই রাতে আন্দোলন চলাকালে ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা আমার বাসার সামনে এসে আমাকে ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলমকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। আমরা যেতে অস্বীকৃতি জানালে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়। ওই রাতেই আমাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল উপস্থিত ছিলেন।’

হাসনাত আরও জানান, ডিজিএফআই কর্মকর্তারা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু অন্য সমন্বয়কদের ছাড়া বৈঠকে বসতে রাজি না হওয়ায় ডিজিএফআই ক্ষুব্ধ হয়। পরে তাদের বাসায় ফেরত না দিয়ে মৎস্য ভবন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মধ্যে অবস্থিত একটি গোপন সেফ হাউজে আটকে রাখা হয়। সেখানে পুরো দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘১৮ জুলাই সারা দিন জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যায় ডিজিএফআইয়ের ডিজিসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সেফ হাউজে এসে সর্বশেষ বারের মতো আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেন। আমরা দেখেছি, এসবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, ডিবিসহ সব গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে আন্দোলন দমন করে ক্রেডিট নেওয়ার একটা প্রতিযোগিতা চলছিল।’

হাসনাত আব্দুল্লাহ জবানবন্দিতে আবু সাঈদ হত্যার জন্য সরাসরি দায়ী পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বেরোবি প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

একই সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত সবার জন্য দায়ীদের বিচারের আহ্বান জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৬ জুলাই বেরোবির সামনে পার্ক মোড়ে দুই হাত প্রসারিত করে নিরস্ত্র অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং পরে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত শেষে ৩০ জনকে আসামি করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। গত ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল এই প্রতিবেদন আমলে নেয়। বর্তমানে এ মামলার ৬ আসামি কারাগারে রয়েছেন। এর আগে গত ২৮ আগস্ট প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন।