উচ্ছেদের নির্দেশ উপেক্ষা করে ইজারা!

খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার সংযোগস্থল চুকনগর বাজার। এ বাজারের প্রধান প্রবেশপথ যতিন-কাশিম সড়ক। একসময় খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের বিকল্প পথ হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত হতো এ সড়ক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের কারণে ৭০ ফুট প্রশস্ত এ সড়কের মাত্র ৩২ ফুট দিয়েই চলছে সব ধরনের যানবাহন। বাকি ৩৮ ফুট জুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০টি আধাপাকা দোকানঘর। ফলে প্রতিদিন যানজট, দুর্ঘটনা আর জনদুর্ভোগ লেগেই থাকে। এ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে গত ৬ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে আগামী তিন মাসের মধ্যে সড়কের পূর্ণ প্রস্থে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয় বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কেএম জাহিদ সারওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। কিন্তু রায়ের এক মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনসাধারণ। তারা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে খুলনা জেলা পরিষদ জানিয়েছে, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুকনগর বাজারের যতিন-কাশিম সড়কের রেকর্ডীয় প্রস্থ ৭০ ফুট। কিন্তু বাস্তবে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত আছে মাত্র ৩২ ফুট। বাকি ৩৮ ফুট জুড়ে গড়ে উঠেছে ৭০টি আধাপাকা দোকানঘর। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব দোকানপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নিয়ে সড়কের জমি ইজারা দিয়েছে খুলনা জেলা পরিষদ। এভাবে ৭ কোটি টাকার বেশি আদায় করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। কিন্তু জেলা পরিষদের কোষাগারে জমা পড়েছে নামমাত্র ইজারা মূল্য, আয়কর ও ভ্যাট। বাকি টাকা পরিষদের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা ভাগ করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, চুকনগর থেকে যশোরের নওয়াপাড়া পর্যন্ত এ সড়ক দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা ইজারা নিয়ে ব্যবসা করে আসছিলেন। ২০২১ সালে যানজট কমানোর কথা বলে সব স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা পরিষদ। কিন্তু উচ্ছেদের পর সড়ক সম্প্রসারণ না করে ২০২২ সালে আবার সেই জমিতে দোকানঘর তৈরি করে পুনরায় ইজারা দেওয়া শুরু হয়। ব্যবসায়ীরা বাধা দিলে তাদের হয়রানি করা হয়। পরে ব্যবসায়ী পার্থ কুমার কুন্ডু জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করেন। কমিশনের নির্দেশে তদন্ত হয়। তদন্তে প্রমাণিত হয়, জনস্বার্থে নয় বরং বাণিজ্যিক স্বার্থে দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এরপর পার্থ কুমারসহ ২৬ জন ২০২১ সালের ১৩ জুন হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। সেই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৬ নভেম্বর আদালত রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, রায় প্রাপ্তির তিন মাসের মধ্যে সড়কের সব অননুমোদিত স্থাপনা (ভবন, দোকান, অস্থায়ী কাঠামোসহ) অপসারণ করে ৭০ ফুট পূর্ণ প্রস্থে ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সড়কের জমিতে কোনো ইজারা বা দখল দেওয়া থেকে জেলা পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পার্থ কুমার কুন্ডু বলেন, ‘আমরা মানবাধিকার কমিশন থেকে শুরু করে হাইকোর্ট পর্যন্ত গিয়েছি। রায় আমাদের পক্ষে এসেছে। এখন শুধু বাস্তবায়ন চাই। আর দেরি হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল বলেন, ‘অবৈধ দোকান উচ্ছেদ হলে ভারী যানবাহন নির্বিঘ্নে চলবে, বাজারে যানজট কমবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।

আমরা দ্রুত রায় কার্যকর চাই।’

খুলনা বিভাগের উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) মো. ইউসুফ আলী ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যে প্রতিবেদন দাখিল করেন, তাতে স্পষ্ট বলা হয় সড়কের জমি ‘জনসাধারণের ব্যবহার্য রাস্তা’ এবং এসএ খতিয়ানে ‘রাস্তা’ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত। জেলা পরিষদ সম্পত্তি বিধিমালা-২০১৭ অনুযায়ী এ ধরনের জমি কোনোভাবেই ইজারা দেওয়া যায় না।

তবে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের (সার্বিক) দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার হুসাইন শওকাত বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। আপিল বিভাগে রায় বহাল থাকলে তবেই উচ্ছেদ কার্যকর করা হবে।’