আফরোজা বেগম (ছদ্মনাম) ভালোবেসে বিয়ে করেন গাজীপুর বারের এক নবীন আইনজীবীকে। আফরোজা ল পাস করে জুনিয়রশিপ করতেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের কোল জুড়ে আসে একটি পুত্র ও এক কন্যাসন্তান। একপর্যায়ে আইনজীবী স্বামী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে তাদের দাম্পত্যজীবনে কলহের সৃষ্টি হয়। পরে তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আফরোজা জানান, অনেক চেষ্টা করেও সংসারটা টেকাতে পারেননি। সন্তানকে নিজের কাছে রাখার জন্য গাজীপুর আদালতে মামলাও করেছেন আফরোজা।
গাজীপুরের ভোগড়া পেয়ারাবাগান এলাকার বাসিন্দা অনামিকা (ছদ্মনাম) স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। সেখানেই কারখানায় অন্য এক পুরুষের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে দাম্পত্য কলহে সংসার ভেঙে যায়। স্বামী রুবেল (ছদ্মনাম) বলেন, চাকরি করে টাকাপয়সার মুখ দেখে স্ত্রী অনামিকা তাকে অপছন্দ করতে থাকেন। দুটি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে অনেক বুঝিয়েছেন। একবার স্ত্রী তার পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেলেও, সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে অনামিকাকে ঘরে তুলে নেন স্বামী রুবেল। কিন্তু কিছুদিন পর স্বামীকে তালাক দিয়ে ফের প্রেমিককে বিয়ে করেন অনামিকা।
এভাবেই গাজীপুরে নানা কারণে প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে সংসার। গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে গাজীপুরে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৩টি। আর বিয়েবিচ্ছেদ হয়েছে ৮ হাজার ১২৯টি। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে অর্ধেকেরও বেশি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে; যা আশঙ্কাজনক বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন বিশিষ্টজনরা।
গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রেশন কার্যালয় সূত্রে জানায়, গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর মহানগরীতে ৮ হাজার ৭৮৭টি বিয়ে সম্পন্ন হয়। আর এ সময়ে বিয়েবিচ্ছেদ হয় ৪ হাজার ৫৭৭টি। মহানগরী ছাড়া গাজীপুর জেলায় মোট বিয়ে রেজিস্ট্রেশন হয় ৫ হাজার ২৮৬টি আর বিচ্ছেদ হয় ৩ হাজার ৫৫২টি। গাজীপুর সদর উপজেলায় বিয়ে রেজিস্ট্রেশন হয় ৭০২টি, বিচ্ছেদ হয় ৪৫৫টি। শ্রীপুর পৌরসভায় ৭৪২টি বিবাহের পর বিচ্ছেদ হয় ২৯১টি। শ্রীপুর উপজেলায় বিয়ে হয় ৮৯৫টি, বিচ্ছেদ হয় ২৯১টি। কালিয়াকৈর পৌর এলাকায় বিয়ে হয় ৬৭৩টি, বিচ্ছেদ হয় ৪৯৭টি। এ ছাড়া কালীগঞ্জ পৌর এলাকায় বিয়ে হয় ১৫৬টি, বিচ্ছেদ ৯১টি। এ উপজেলায় বিয়ে হয় ৭৩২টি, বিচ্ছেদ হয় ২৮৪টি। কাপাসিয়া উপজেলায় বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হয় ৬১৮টি আর বিচ্ছেদ হয় ৪০১টি।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর থানায় ১ নম্বর ওয়ার্ডে আট মাসে ১২৬টি বিয়ে হয়। আর এ সময়ে বিচ্ছেদ হয়েছে ১৩৩টি। ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ১৩১টি বিয়ের হলেও বিচ্ছেদ হয়েছে ১৭৪টি, ২৪ নম্বর ওয়ার্ড ৭৩টি বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হলেও বিচ্ছেদ হয় ১১৯টি বিয়ে। অন্যদিকে কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া ইউনিয়নে আট মাসে ২১টি বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৫৩টি বিয়ে।
বিশিষ্টজনরা বলছেন, বিয়েবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা, মাদকের আসক্তি, পারিবারিক চাপ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ইত্যাদি। এ ছাড়া বিয়েবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে ভরণপোষণে স্বামীর অক্ষমতা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মনের মিল না হওয়া ইত্যাদি বিষয়কে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন নারীরা। বিয়েবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীরাই বেশি আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে গাজীপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুকুল কুমার মল্লিক বলেন, বিশ্বায়নের প্রভাব, রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন, পরিবার ও সমাজে মূল্যবোধ চর্চার অভাব, ব্যক্তি স্বাধীনতার চর্চা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও শূন্যতা বিয়েবিচ্ছেদের বড় কারণ।
আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন বলেন, সম্পর্কের যতœ ও ভালোবাসার অভাবেও বিয়েবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক টানাপড়েনও দাম্পত্যজীবনে সমস্যা হতে পারে। আয়-ব্যয়ে পার্থক্য, সঞ্চয় ও খরচের অভ্যাসে মিল না থাকায় দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত তা তালাকে গড়ায়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন গাজীপুর মহানগর কমিটির কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর একটা শিল্পাঞ্চল; সারা দেশের মানুষই এই এলাকায় বসবাস করেন, চাকরি করেন। অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজন কারখানার শ্রমিক। স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ একজন অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। শেষে বিষয়টি তালাকে গিয়ে ঠেকে। বিশিষ্টজনরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি করতে না পারলে দিন দিন তালাকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।