রাজশাহী জুড়ে এখন নির্বাচনী উত্তেজনা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা মাঠ গরম করে তুলেছেন। ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রত্যেকটিতে দুই দলের প্রার্থীরা প্রচারণায় ব্যস্ত। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে নেতাকর্মীরা ভোটের আমেজে চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। তবে ছয় আসনের মধ্যে বিএনপির দুটিতে দলীয় প্রার্থীকে ঘিরে কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হলেও বাকি চারটিতে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা এখনো পুরোপুরি দলীয় নির্দেশনা মেনে নেননি। তাদের সমর্থকরা দলীয় প্রার্থীকে সম্পূর্ণ সমর্থন দেবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিএনপি প্রার্থীরা অতিরিক্ত চাপে পড়তে পারেন।
অবশ্য স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতারা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন এবং উদ্যোগও নিয়েছেন। কিন্তু মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অনুসারীরা এখনো কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অনেক মনোনয়নবঞ্চিত নেতার অনুসারী মনোনয়নপ্রাপ্তদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন বা তলে তলে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ধানের শীষের পক্ষে সবাই এক হয়ে যাবেন বলে দাবি করছেন স্থানীয় নেতারা।
বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পর রাজশাহীর চারটি আসনে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। চারটি আসনেই মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অনুসারীরা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বিক্ষোভ কমে এলেও বিভক্তি এখনো প্রকাশ্যে রয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহীর সব আসনে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ছয়টি, খেলাফত মজলিস পাঁচটি, বাসদ তিনটি, গণসংহতি আন্দোলন দুটি, গণ অধিকার পরিষদ তিনটি, এবি পার্টি তিনটি, বিজেপি একটিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা ভোটের মাঠে সক্রিয়।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) : এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিন। তার ভাই ব্যারিস্টার আমিনুল হক তিনবারের এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন। আরেক ভাই এম এনামুল হকও একবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। এ ধারাবাহিকতায় দল শরীফ উদ্দিনকে বেছে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর এ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পাঁচবার করে, জামায়াত একবার এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার জয়ী হয়েছেন। বিএনপির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এ আসন পুনরুদ্ধারে শরীফ উদ্দিনকে প্রার্থী করা হয়েছে। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশী সুলতানুল ইসলাম তারেকের অনুসারীরা বিরোধিতা করে মাঠে রয়েছেন। তারা বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করেছেন। মনোনয়ন ঘোষণার পর তানোরে দুপক্ষের সংঘর্ষও হয়েছে। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৮৬ সালে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্য প্রার্থীরা হলেন গণ অধিকার পরিষদের মীর মো. শাহজাহান, এবি পার্টির অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান মুহসেনী, বাসদের আফজাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি আরিফুল ইসলাম।
রাজশাহী-২ (সদর) : মহানগর এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্গঠিত হয়। তারপর জাতীয় পার্টি একবার ও বিএনপি তিনবার জয় পেয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিন নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। সবশেষ ২০২৪ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘ডামি’ প্রার্থী শফিকুর রহমান বাদশা জয়ী হয়েছিলেন। এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু। তিনি সাবেক এমপিও। মনোনয়ন ঘোষণার পর নেতাকর্মীরা তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। দলের মধ্যে বিভক্তি দূর হয়ে সবাই এক কাতারে এসেছেন।
মহানগর বিএনপি ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছে। শহর জুড়ে প্রচারণা শুরু হয়েছে। এ আসনে বিএনপির কোনো দ্বন্দ্ব নেই। জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সক্রিয়। অন্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলনের ফয়সাল হোসেন মনি, বাসদের সামছুল আবেদীন, এবি পার্টির সাঈদ নোমান, খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ উল্লাহ শাহীন, গণসংহতি আন্দোলনের মুরাদ মোর্শেদ প্রমুখ।
রাজশাহী-রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) : ১৯৮৬ সালের আগে সীমানা পুনর্গঠিত এ আসনে বিএনপি তিনবার, আওয়ামী লীগ চারবার, জাতীয় পার্টি দুবার জয়ী হয়েছে। এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক শফিকুল হক মিলন। প্রার্থী বদলের দাবিতে মনোনয়নপ্রত্যাশী রায়হানুল আলম রায়হান ও নাসির হোসেনের অনুসারীরা মাঠে রয়েছেন। তারা মশাল মিছিল, বিক্ষোভ ও অবরোধ করছেন। তবে মিলনের মাঠপর্যায়ের কাজের কারণে তার অবস্থান শক্তিশালী। জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সক্রিয়। অন্যরা কম দৃশ্যমান।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) : পুনর্গঠনের পর বিএনপি তিনবার, আওয়ামী লীগ পাঁচবার জয়ী। এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া। নেতাকর্মীদের একাংশের অসন্তোষ রয়েছে। প্রার্থী বদলের দাবিতে ৩৭ নেতা লিখিত আবেদন করেছেন। জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবদুল বারী। বিভক্তি চললে জামায়াত সুবিধা পেতে পারে।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) : বিএনপি চারবার, আওয়ামী লীগ ছয়বার জয়ী। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন নজরুল ইসলাম মন্ডল। বদলের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন।
রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) : বিএনপি চারবার, আওয়ামী লীগ পাঁচবার জয়ী। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন আবু সাঈদ চাঁদ। তার বিরুদ্ধে কেউ মাঠে নামেননি। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নাজমুল হক।
বিএনপির বিভক্ত আসনগুলোতে জামায়াত সুবিধা পেতে পারে। তবে নেতারা বলছেন, শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের পক্ষে সবাই মাঠে নামবেন।