বাংলাদেশের সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি) অবিলম্বে বাতিল এবং নতুন করে সব জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প বন্ধের জোরালো দাবি উঠেছে তৃতীয় জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ-২০২৫ থেকে।
জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী ও দেশি-বিদেশি জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইইপিএমপি বাংলাদেশকে দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিনির্ভর কয়লা এবং এলএনজি ব্যবস্থার মধ্যে আটকে দিচ্ছে, যা জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
গতকাল রবিবার ঢাকায় দুদিনব্যাপী এই সমাবেশের সমাপনী দিনে জলবায়ু ন্যায্যতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনগণের অধিকার বিষয়ে আট দফা ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সমাবেশে উপকূল, হাওর, চর ও বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে আসা জেলে, কৃষক, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, যুব, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীসহ প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি অংশ নেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে জলবায়ু পরিবর্তন, শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব তুলে ধরেন তারা।
সমাপনী অনুষ্ঠানে আট দফা ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করে ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) সদস্য সচিব শরীফ জামিল। এতে সভাপতিত্ব করেন জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ-২০২৫-এর আহ্বায়ক ড. মুজিবুর রহমান।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আইইপিএমপির পাশাপাশি মহেশখালী-মাতারবাড়ী উন্নয়ন উদ্যোগের মতো মেগা শিল্প-পরিকল্পনাগুলো বাংলাদেশের চরম জলবায়ু ঝুঁকি উপেক্ষা করে কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির কারণে অর্থনীতির ওপর বাড়ছে চাপ।
শরীফ জামিল বলেন, এসব পরিকল্পনা বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। এগুলো ব্যয়বহুল আমদানি করা কয়লা ও এলএনজি-নির্ভরতা বাড়ায়। বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা চাপায় এবং জনগণকেন্দ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে।
সমাবেশ থেকে বিদ্যমান কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক প্রকল্প ধাপে ধাপে বন্ধের জন্য সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ এবং অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বন্ধ করে ‘বিদ্যুৎ নেই, পেমেন্ট নেই’ নীতি চালুরও দাবি জানানো হয়।
ঘোষণাপত্রে সরকারকে জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা পুনর্গঠন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এতে ব্যাটারি সংরক্ষণসহ সৌরবিদ্যুৎ, স্মার্ট গ্রিড এবং পর্যাপ্ত জাতীয় বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
প্রতিনিধিরা বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন অবশ্যই ঋণ নয়, অনুদান হিসেবে দিতে হবে এবং শিল্পোন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক নিঃসরণের দায় হিসেবে এটিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তারা দ্রুত লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কার্যকর করা এবং বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধির দাবি জানান।
সমাবেশে নদীভাঙন, লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বায়ু ও পানিদূষণ, বন উজাড় এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির সম্প্রসারণ ও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এসব সংকটকে আরও তীব্র করছে এবং মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছে।
সুন্দরবনসহ অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনসংরক্ষণ, দূষিত নদী পুনরুদ্ধার, শিল্প দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ভূমি দখল এবং দুর্নীতির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবিও উঠে আসে।
ফসিল ফুয়েল নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভের কৌশলগত উপদেষ্টা হারজিৎ সিং বলেন, ‘জলবায়ু ন্যায্যতা শুধু দেশগুলোর মধ্যকার বিষয় নয়; এটি দেশের ভেতরের বৈষম্য এবং আমরা যে উন্নয়ন মডেল বেছে নিচ্ছি, তার সঙ্গেও জড়িত। এখন সময় এসেছে ধ্বংসাত্মক এসব উন্নয়নের পথ প্রত্যাখ্যান করার।’
সমাবেশের সহ-আহ্বায়ক এমএস সিদ্দিকী বলেন, ‘রামপাল প্রকল্পসহ যেসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম, আজ তার ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্ট। তরুণদের সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহভাবে যুক্ত করা জরুরি। মানবাধিকার ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইনি পথেও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে।’
তৃতীয় জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ-২০২৫-এর আয়োজন করে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)। সহ-আয়োজকদের মধ্যে ছিল ব্রাইটার্স, ব্রতী, সিপিআরডি, কোস্ট ফাউন্ডেশন, ক্রেসল, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, ওএবি ফাউন্ডেশন ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে ছিল এপিএমডিডি, ফসিল ফুয়েল নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ, ফসিল ফ্রি জাপান, এলডিসি ওয়াচসহ বিভিন্ন সংগঠন।
আয়োজকরা জানান, আট দফা জনগণের এই ঘোষণা সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে। তাদের আশা, এটি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর জ্বালানি পরিকল্পনার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বাংলাদেশে একটি ন্যায়ভিত্তিক, নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ও জনগণকেন্দ্রিক রূপান্তরের পথ তৈরি করবে।