ফেনী বিএনপিতে অনৈক্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ফেনী জেলার তিনটি আসনের একটির প্রার্থী খালেদা জিয়া। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি চিকিৎসাধীন থাকায় এ আসনের স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রচারেও প্রভাব পড়েছে। আরেকটিতে ধানের শীষের প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ এবং অন্য একটিতে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তৃণমূলে অস্থিরতা এখনো দৃশ্যমান। ফেনীর তিন আসনে এর আগে বিএনপির প্রার্থীরা একাধিকবার নির্বাচিত হলেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছে জামায়াত। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও ফেনীর তিনটি আসন পেয়েছিল বিএনপি। এর পরের তিনটি নির্বাচনেই একতরফা ভোটে আসনগুলো দখল করে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটভুক্ত দল জাসদ ও জাতীয় পার্টি।

অন্যদিকে তিনটি আসনেই বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিরামহীন প্রচারণায় চাঙ্গা অবস্থানে রয়েছে সংঘবদ্ধ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোটের শরিক ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন পৃথক প্রার্থী ঘোষণা করে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া একটি আসনে এবি পার্টি, একটি আসনে জেএসডি ও একটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে এনসিপি।

এবার ফেনীর দুটি আসন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও অন্য দুই শীর্ষস্থানীয় নেতা নির্বাচন করছেন। তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দীর্ঘদিনের পুরনো মিত্র বিএনপি-জামায়াত দল দুটি একে অন্যের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছে।

বিএনপি জামায়াতের যারা প্রার্থী : ফেনী-১ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ফেনী-২ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপিকে এবং ফেনী-৩ আসনে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও শিল্পোদ্যোক্তা আবদুল আউয়াল মিন্টুকে ধানের শীষের মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

জামায়াতে ইসলামী থেকে ফেনী-১ আসনে এস এম কামাল উদ্দিন, ফেনী-২ আসনে দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, ফেনী-৩ ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. ফখরুদ্দিন মানিককে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ফেনী-২ (সদর) এ আসনে জাসদ থেকে বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়ে জয়নাল আবেদীন ভিপি দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ফেনী-১ (ছাগলনাইয়া-ফুলগাজী-পরশুরাম) : বিএনপি দলীয় প্রার্থী নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে এ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো বিরোধ দেখা না গেলেও ফেনী-১ ফুলগাজী-পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া আসনে ঘোষিত প্রার্থী খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে নেতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত দলীয় চেয়ারপারসনের প্রার্থিতা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। আসনটিতে খালেদা কিংবা জিয়া পরিবারের বিকল্প কাউকে ধানের শীষ প্রতীক দিতে চাইলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তির সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। এ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বেগম জিয়া।

ফেনী-১ আসনে খালেদা জিয়ার পক্ষে নিয়মিত গণসংযোগ করে যাচ্ছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু। তিনি বলেন, ‘ফেনীর মেয়ে খালেদা। তিনি যতদিন জীবিত আছেন, ততদিন তার বিকল্প এখানকার ভোট নিয়ে কেউ ভাবছে না। অতীতের মতো সামনেও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।’

খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ আসনে প্রার্থী হওয়া জামায়াত নেতা এস এম কামাল উদ্দিন ঢাকায় থাকেন। গত ৮-৯ মাস ধরে তিনিও বিরামহীন গণসংযোগ করেছেন। জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘অতীতে এই আসন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও উপনির্বাচনে তিনি অন্যকে ছেড়ে দিতেন। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এবার দাঁড়িপাল্লাকেই জয়ী করবেন ভোটাররা।’

ফেনী-২ (সদর) : ফেনী-২ সদর আসনে বিএনপি ঘোষিত প্রার্থী জয়নাল আবেদীন ভিপিকে পরিবর্তনের জন্য কেন্দ্রে রিভিউ আবেদন করেছেন জেলার শীর্ষ নেতারা। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল অভিনব কায়দায় ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে রিভিউ ভঙ্গিতে ছবি তুলে নিজেদের দলীয় প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এর প্রভাব পড়ছে ভোটের প্রচারেও। আলাল ছাড়াও ভিপি জয়নালের বিকল্প হিসেবে আসনটিতে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মশিউর রহমান বিপ্লব ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হাবীবুল্লাহ মানিকের নাম আলোচনায় রয়েছে।

বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জয়নাল আবেদীন ভিপি বলেন, আমার সততা ও অতীত ইতিহাসের কারণে দল প্রার্থী করেছে। দলীয় হাইকমান্ড যাকে উপযুক্ত মনে করেছে তাকে দিয়েছে। আশা করছি নির্বাচনের সময় সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করবে। ইতিমধ্যে আমরা ধানের শীষের পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি।

এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়াও এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করে চলেছেন এবং নিয়মিত সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মীরাও তার পক্ষে কোমর বেঁধে নেমেছেন।

ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) : ফেনী-৩ আসনে দুপক্ষের হামলা-মামলাসহ দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মধ্যেও মাঠে নেমে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে নির্বাচনী প্রচার স্থগিত করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু। গত ২৯ নভেম্বর সোনাগাজীতে অনুষ্ঠিত এক দোয়া মাহফিলে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তার সুস্থতা অগ্রাধিকার। তাই তিনি সব ধরনের প্রচার স্থগিত ঘোষণা করেছেন। তবে তার পক্ষে স্থানীয় নেতারা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ আসনে আরও প্রার্থী হয়েছেন জেএসডির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাইফ উদ্দিন শিপন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক মুসা, খেলাফত মজলিশ থেকে জেলার সাবেক সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ আলী, এনসিপির আবুল কাশেম।

জামায়াতের প্রার্থী ডা. মো. ফখরুদ্দিন মানিক বলেন, ‘দলীয়ভাবে প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে তিনি এলাকায় নিয়মিত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন। পুরনো রাজনীতি পরিবর্তন চান ভোটাররা।’