স্বরাষ্ট্র ও আইন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়েই তার পদত্যাগ দাবি করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম। গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ডাকসু ভিপির নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে সচিবালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করে।

ডাকসু ভিপি বলেন, তিন দফা দাবি অনতিবিলম্বে না মানা হলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন না দেখাতে পারলে স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হবে।

৩ দফা উল্লেখ করে সাদিক কায়েম বলেন, আমাদের ভাই ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ হামলাকারী, পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারী সব সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাষ্ট্রের সব সংশ্লিষ্ট অর্গানকে দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং যাদের গাফিলতি প্রমাণ হবে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে যারা এই হামলাকে সমর্থন জুগিয়েছে, হাদি ভাই ও জুলাই বিপ্লবীদের হত্যাযোগ্য করে তুলেছে, সেই কালচারাল ফ্যাসিস্টদের সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বয়কট করতে হবে। এসব ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে দৃশ্যমান করতে হবে।

আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধ লীগের বিরুদ্ধে এলাকাভিত্তিক চিরুনি অভিযান শুরু করতে হবে। নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের সব সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের অবহেলা আমরা আর সহ্য করব না।

ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রথম ও অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে খুনি হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রদত্ত রায় কার্যকর করতে হবে। গণহত্যাকারী সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার প্রতিবাদে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অভিযুক্তদের ফেরত না দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যাবে না।

এই সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। হাদিকে গুলি করা ঘাতক ভারতে পালিয়ে গেল কীভাবে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা পরে কথা বলব।’ ‘আসামিরা দেশে আছে, নাকি বিদেশে পালিয়ে গেছে, বিষয়টি মানুষ এখন জানতে চাচ্ছেন’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সবকিছু তো এখানে বলা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের প্রতিটি দাবি যৌক্তিক। এই দাবিগুলো গতকাল মিটিংয়েও আমরা বলেছি, এগুলো বেগবান করতে হবে। এই যৌক্তিক দাবিগুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন করব।’ ‘ওসমান হাদি অসুস্থ, আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন। তিনি যেন আবার সুস্থ হয়ে আমাদের মধ্যে ফিরে আসতে পারেন।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ চেয়ে শাহবাগ অবরোধ : দেশে চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং ওসমান হাদির ওপর হামলায় জড়িতরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছে ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে টানা সাড়ে ৩ ঘণ্টা এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি।

অবরোধের ফলে শাহবাগ ও এর আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হলে যানচলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অযোগ্যতার অভিযোগ : জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান অভিযোগ করে বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির সম্পূর্ণ দায় বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার। তথাকথিত ‘ডেভিল হান্ট’ ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলির ঘটনা ঘটেছে।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, মাত্র চার ঘণ্টায় হাইকোর্টে ৮০০ মামলায় জামিন দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। সন্ত্রাসীদের এমন ঢালাও জামিন দেওয়া বন্ধ না হলে এবং বিচার বিভাগের এই ‘উদাসীনতা’ দূর না হলে ভবিষ্যতে আইন উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিও তোলা হবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি অধিকার পরিষদের : হাদিকে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় শ্যুটারকে গ্রেপ্তারে ব্যর্থতাকে সরকার ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার চরম ব্যর্থতা দাবি করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতারা। সোমবার ঢাবির মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গণে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তারা এ দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বলেন, গত এক থেকে দেড় বছরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ওপর গুলি চালানোর মতো ঘটনার পরও অপরাধীদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারে তিনি কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। তার মূল দায়িত্ব ছিল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু তিনি সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অতিসত্বর তার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে। না হলে তাকে আমরা ঘাড় ধরে নামাতে বাধ্য হব।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানিয়েছে, জুলাই বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদির হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থতা ও দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয় ছাত্রশক্তি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা। গতকাল সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।

এ সময় ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাদিয়া রহমান অন্বেষা বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে আমরা সতর্ক করে বলতে চাই, আজ ওসমান হাদি ভাইয়ের ওপর যে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে আগামীতে একই ধরনের ঘটনা অন্য কোনো উপদেষ্টার ওপর ঘটবে না এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আপনারা এই হত্যাচেষ্টার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন। মনে রাখতে হবে, এভাবে নীরব থাকলে আপনারাও ভবিষ্যতে এমন টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হওয়া থেকে নিরাপদ থাকবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

হাদির ওপর গুলির প্রতিবাদে শহীদ মিনারে সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশ : হাদির ওপর গুলির ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশ’ হয়েছে। সমাবেশ থেকে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া, সমাবেশে মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ পাঠ করা হয়। গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, ‘আজকের সাংস্কৃতিক লড়াই মূলত মুজিববাদবিরোধী লড়াই। কিন্তু এই লড়াইয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। কারণ সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের যে ডিমার্কেশন লাইন থাকা দরকার, সেখানে আমরা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারিনি। এই অদৃশ্য বিদেশি অ্যাসেটদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ওসমান হাদি। তার এই অবস্থানের কারণেই তাকে হত্যার যুক্তি তৈরি করা হয়েছে। তাকে গুলি করা হয়েছে, অথচ তখন সবাই নীরব ছিল। কেউ প্রতিবাদ করেনি সবাই আমাদের সঙ্গে নাটক করেছে।’

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখ-তাও বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, নৈতিকভাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আর এই দায়িত্বে থাকতে পারেন না। যারা জুলাইকে টার্গেট করছে, মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন অঙ্গনে যারা মুজিববাদী রাজনীতি পুনরায় চালু করতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের গণপ্রতিরোধ জারি থাকবে।’

নাহিদ বলেন, ‘৭২ ঘণ্টা পার হলেও খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পারে নাই। আগামীকাল উৎসব করতে রাস্তায় নামব না, আগামীকাল প্রতিরোধের জন্যে রাস্তায় নামব। সবাইকে আহ্বান করব আগামীকাল বিজয় উৎসব করতে রাস্তায় নামব না, নামব প্রতিরোধের জন্যে।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী জনতার ঐক্যের প্রতীক শরিফ ওসমান হাদি। তফসিল ঘোষণার পরদিন একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে না। এটা প্যাকেজ প্রোগ্রাম। ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনা ‘ইন্টেলিজেন্স ফেইলিউর’। হাদির ওপর আক্রমণের আগে থেকেই সে বলছিল, ‘আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি’। কথাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ইন্টেলিজেন্সের সবাই জানার পরও তার নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থা কী ব্যবস্থা নিয়েছে? এই ফেইলিউরের জন্য সরকারকে জবাব দিতে হবে।

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) সেক্রেটারি আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বলেন, ৭১ এর আজাদির লড়াই ভারত গ্রাস করেছিল। সীমান্তের ওপারে আমাদের কখনো বন্ধু ছিল না। আমাদের মধ্য থেকে কিছু ঘাপটি মেরে থাকা খলনায়ক রয়েছে, যারা দেশকে বিক্রি দেওয়ার চেষ্টা করছে। হাদির ঘটনায় আমরা জানি কারা আক্রমণ করেছে, কিন্তু এরপরও কেন আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে পালাতে সুযোগ করে দিল। আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাটির নিচ থেকে বিএনপি- জামায়াতকে ধরতে পারত, তারা এখন কোথায়? তারা এখন কেন অপরাধীদের ধরতে পারছে না।

সভাপতির বক্তব্যে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে বলতে চাই এই ওসমান হাদির বাংলাদেশে ভারতের দালালি করে কোনো দল ক্ষমতায় যেতে পারবে না, ক্ষমতায় টিকেও থাকতে পারবে না। আপনারা আগামীকাল থেকে দেশের সবগুলো ওয়ার্ডে সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গণকমিটি’ গঠন করে ফ্যাসিবাদের দোসরদের আইনের হাতে তুলে দিন।

সমাবেশে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আপ বাংলাদেশের মুখপাত্র আলী আহসান জুনায়েদ, গণ অধিকার পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএস সালাউদ্দিন আম্মার, জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জাহিদ আহসান উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতা উপস্থিত না থাকলেও দলটির পক্ষ থেকে সমাবেশে সংহতি জানানো হয়।