ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত

বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবুও বাণিজ্য ছাড় নিয়ে মতের মিল না হওয়ায় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ৪০ বিলিয়ন ডলারের (৪ হাজার ১৬০ কোটি) বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কছাড় সুবিধা দিতে রাজি হয়েছিল লন্ডন, কিন্তু এতে সন্তুষ্ট ছিল না ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা চাইছিলেন, শুল্কমুক্ত ক্ষেত্রের পরিধি যেন আরও বাড়ানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এই চাওয়ার সঙ্গে একমত হতে পারছিলেন না ব্রিটেনের কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, এই ইস্যুতে চলতি ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে তাদের। কিন্তু উভয়পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় এই চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। এক কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সবসময়েই দৃঢ় ছিল এবং এখনো তা আছে। আমরা দুটি লক্ষ্য পূরণে এই চুক্তির অংশীদার হয়েছিলামÑ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের সাধারণ জনগণের কাছে প্রযুক্তিগত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাকে আরও সহজলভ্য করা।

যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘ল্যান্ডমার্ক সমঝোতা’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই বাণিজ্যিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে এখন থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বেসামরিক খাতে পরমাণু শক্তির ব্যবহার, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিসহ সামরিক-বেসামারিক এবং কৌশলগত বিভিন্ন খাতে দুই দেশ সহযোগিতামূলক বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করছে। এই সম্পর্কের আওতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হবে এবং এমন সব উদ্যোগ নেওয়া হবেÑ যা সাধারণ নাগরিকদের বাস্তব জীবনকে সহজ ও লাভবান করবে। বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছিলেন, এই বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেনের জনগণ নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও বিশ্বের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল।

এদিকে, ইউরোপের আঞ্চলিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওপর ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে ব্যয় বাড়াতে বলেছেন ট্রাম্প। তা না হলে জোটে তহবিল কমিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দেশগুলোও তাদের ভাবনায় বদল আনছে। বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে ইউরোপকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ উঠেছে। জার্মানির স্ট্রাসবার্গে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গতকাল বুধবার ইইউ প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি এখন আর বিকল্প নয়, এটি বাধ্যতামূলক।’ তিনি আরও বলেন, ইউরোপকে অন্য কারও ওপর নির্ভর করে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করতে দেওয়া যাবে না। ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বৈশ্বিক জিডিপিতে ইউরোপের শেয়ার কমে যাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক। তবে যুক্তরাষ্ট্রও একই পথে এগোচ্ছে। ফন ডার লিয়েন ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে জোর দিয়ে বলেন, নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাধীন হওয়াই এখন সময়ের দাবি। ইইউ কমিশনের এই হুঁশিয়ারি আসে এমন এক সময়ে যখন ইউরোপীয় দেশগুলো বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফন ডার লিয়েনের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে যে, ইউরোপকে এখন নিজের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কৌশল পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউরোপ ২০২৭ সালের মধ্যে ন্যাটোর প্রচলিত প্রতিরক্ষা ক্ষমতার (গোয়েন্দা তথ্য থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত) অধিকাংশ দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিক। ইতিমধ্যে পশ্চিমা কূটনীতিকদের এ নিয়ে বার্তা দিয়েছে পেন্টাগন। এত কম সময়ের মধ্যে এত বড় দায়িত্ব নেওয়ার সময়সীমাকে অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তাই ‘অবাস্তব’ বলে মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি ইউরোপ ২০২৭ সালের এই সময়সীমা পূরণ করতে না পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর কিছু প্রতিরক্ষা সমন্বয় ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারে। ন্যাটোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপীয় সদস্যদের কাঁধে সরিয়ে নেওয়া হলে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্রদের সঙ্গে কাজ করার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে।