কিলিং মিশনে ভাড়া করা হয় ৫ অস্ত্র

ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ভাড়া করা হয়েছিল পাঁচটি দেশি-বিদেশি অস্ত্র। আগারগাঁওয়ে মূল সন্দেহভাজন আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের বোনের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ম্যাগাজিন ও গুলির ব্যাগের সূত্র ধরে তিনটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাব বলছে, অস্ত্রগুলোর মধ্যে দুটি অস্ত্র পালানোর সময় সঙ্গে রাখেন ফয়সাল এবং মোটরসাইকেলের চালক আলমগীর শেখ। বাকি তিনটি অস্ত্র বাবার কাছে পাঠানোর জন্য গ্রেপ্তার হওয়া বন্ধু মো. ফয়সালকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে বোনের বাসা থেকে ম্যাগাজিন উদ্ধারের খবর শুনে গ্রামের একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় অস্ত্রগুলো। গতকাল বুধবার র‌্যাব সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। এদিকে আপাতত তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মেডিকেল বোর্ড।

গতকাল সন্ধ্যায় ফয়সালের বাবা, মা ও শ্যালকের বন্ধু মো. ফয়সালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রোকনুজ্জামান জানান, গতকাল ফয়সালের বাবা-মাকে আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। এ মামলায় তারা দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা তা রেকর্ডের আবেদন করেন। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাদের বিচারকের খাসকামরায় নেওয়া হয়।

র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হাদিকে গুলি করার পরপরই আগারগাঁওয়ে বোনের বাসায় ওঠেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল। ব্যাগের ভেতর অস্ত্র রাখার বিষয়টি জানতেন ফয়সালের বাবা, মা, স্ত্রী ও শ্যালক। অস্ত্রভর্তি ব্যাগটি ছিল ফয়সালের বাবার জিম্মায়। বাবা হুমায়ূন করিম অস্ত্রের বিষয়টি জানলেও তিনি এটি গোপন রাখেন। গত মঙ্গলবার রাতে স্ত্রী ও মাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা স্বীকার করেন, অস্ত্রগুলো গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। স্ত্রী ও মায়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুকুর থেকে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করেন র‌্যাব সদস্যরা।

র‌্যাবের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ওই বাসায় যাওয়ার পরই তার বাবার কাছ থেকে অস্ত্রভর্তি ব্যাগ লুকানোর জন্য প্রস্তুতি নেন ফয়সাল। এ সময় ওই বাসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে অস্ত্রসহ ব্যাগটি রান্নাঘরের জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। পরে যখন জানতে পারেন তারা কোনো বাহিনীর সদস্য নন, বরং দুজন লোক বাসাভাড়া নিতে এসেছেন, তখন ফয়সালের স্ত্রী বাসার নিচে গিয়ে ব্যাগটি তাড়াহুড়ো করে বাসায় নিয়ে আসেন। কিন্তু তখন দুটি ম্যাগাজিন ও গুলি ব্যাগ থেকে পড়ে যায়।

র‌্যাব সূত্র আরও জানায়, ব্যাগটিতে তখনো পাঁচটি অস্ত্র ছিল। ফয়সাল প্রথমে বাবার কাছেই ব্যাগটি চান। যখন ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা দেবেন, তখন নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ফয়সাল করিম ও আলমগীর শেখ দুটি অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে যান। বাকি তিনটি অস্ত্র একটি ব্যাগের ভেতর ভরে শ্যালক সিপুর মাধ্যমে তার আরেক বন্ধু মো. ফয়সালের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। মো. ফয়সাল নরসিংদীর গ্রামের বাড়ির পুকুরে অস্ত্রগুলো ফেলে দেওয়ার সময় দুটি ম্যাগাজিন না থাকার কথা বলেন। এরপর সিপু তার দুলাভাইকে ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে জানান যে দুটি ম্যাগাজিন নেই।

র‌্যাব সূত্র আরও জানায়, এ খবর পাওয়ার পর ফয়সাল করিম তার শ্যালক সিপুকে মেসেঞ্জারে কল করে তার বোনের কাছে দিতে বলেন। ফয়সাল তার স্ত্রীকে বলেন ব্যাগ থেকে ম্যাগাজিনগুলো দ্রুত নিয়ে আসার জন্য। তা না হলে সবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হবেন। এরপর বিষয়টি ফয়সালের মায়ের কাছে জানালে তার মা স্ত্রীকে বলেন বাসার নিচ থেকে দ্রুত সেগুলো নিয়ে আসার জন্য।

অস্ত্রসহ ফয়সালের বাবা-মা গ্রেপ্তার : হাদিকে গুলি করার ঘটনায় নরসিংদী থেকে ফয়সালের বাবা-মাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন শুটার ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা হুমায়ূন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০) এবং মো. ফয়সাল (২৫) নামের এক যুবক। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র দিয়ে হাদিকে গুলি করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের কোনো একটি দিয়ে হাদিকে গুলি করা হয়েছে কি না তা ফরেনসিক পরীক্ষার পর জানা যাবে।

র‌্যাব জানায়, অস্ত্র ও গোলাবারুদ নরসিংদীর সদর থানাধীন তরুয়া এলাকার মোল্লার বাড়ির সামনে তরুয়ার বিলের পানির মধ্য থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, একটি খেলনা পিস্তল ও ৪১ রাউন্ড গোলাবারুদ।

ভুয়া নম্বর প্লেটসহ মোটরসাইকেল উদ্ধার : গতকাল ডিএমপি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হাদির ওপর হামলায় ব্যবহৃত ভুয়া নম্বর প্লেটসহ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। আগারগাঁওয়ের বনলতা আবাসিক এলাকায় একটি বাড়ির নিচতলার পার্কিং থেকে মোটরসাইকেল ও হেলমেটটি উদ্ধার করা হয়। পরে ভুয়া নম্বর প্লেট পরিত্যক্ত অবস্থায় ম্যানহোলের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়।

এর আগে এ ঘটনায় মোটরসাইকেলের মালিক সন্দেহে আবদুল হান্নান নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তবে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে গ্রেপ্তার হান্নানের কোনো যোগসূত্র মিলেছে কি না তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।

ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সিটিটিসির একটি টিম সিসি ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণের মাধ্যমে হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেট পরিবর্তনের বিষয়টি উদঘাটন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শেরেবাংলা নগর থানাধীন পশ্চিম আগারগাঁও বনলতা আবাসিক এলাকায় একটি বাড়ির নিচতলার পার্কিং থেকে মোটরসাইকেল ও হেলমেটটি উদ্ধার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মোটরসাইকেলটির মালিকানা শনাক্ত করতে নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হয়। হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির প্রথম মালিক ছিলেন আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। পরে শহিদুল, রাসেল, মার্কেটপ্লেস, ওবায়দুল ইসলাম, আনারুল, ওবায়দুলের হাত ঘুরে শুভ নামের একজন মোটরসাইকেলটি কেনেন। আট ব্যক্তির হাতবদলের পর হামলার ঘটনায় জড়িত প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী মো. কবিরের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে মাইনুদ্দিন ইসলামের নামে মোটরসাইকেলটি কেনা হয়।

১২ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার শেষে রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করছে।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ মো. ওসমান হাদির মস্তিষ্কের গতকালও সিটি স্ক্যান করা হয়। তাতে দেখা গেছে ইস্কেমিয়া বেড়েছে। সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পর এ নিয়ে দুই দফায় সিটি স্ক্যান হলো। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। অবস্থা আগের মতোই আশঙ্কাজনক। গতকাল সন্ধ্যায় ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) সদস্য সচিব ডা. মো. আবদুল আহাদ এক ভিডিও বার্তায় এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, অন্য কোথাও নয়; আপাতত তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। তিনি বলেন, তার মস্তিষ্কে গুলির যে অংশ আছে, তা বের করার জন্য অস্ত্রোপচার করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তা বের করা হলেও মস্তিষ্ক সচল হবে কি না কতটুকু সুফল আসবে, তা বলা যাচ্ছে না।

এদিকে গতকাল দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চ ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, হাদির শরীর এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করতে হলে আগে তার শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। চিকিৎসা সিঙ্গাপুর বা ইংল্যান্ড যেকোনো দেশে হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তবে ব্রেন সক্রিয় করার জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে চিকিৎসকদের প্রধান লক্ষ্য হলো শরীর ও মস্তিষ্কের মধ্যে সংযোগ পুনঃস্থাপন করা। হাদির মস্তিষ্ক ছাড়া শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কার্যকর রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চ শরিফ ওসমান হাদির পরিবারের পক্ষ থেকে তার সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে বিশেষ দোয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পরিবারের প্রত্যাশা, আল্লাহ যেন তাকে হায়াতে তাইয়েবা দান করেন।