নান্দনিক স্থাপত্যের অনন্য মসজিদ

কুয়েতের আল-মাসায়েল এলাকায় অবস্থিত মামলুকি ল্যানসেট মসজিদ। মামলুকি স্থাপত্যশৈলীর গাম্ভীর্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে এই মসজিদে। স্থপতি জাসিম আল-সাদ্দাহর দীর্ঘ তিন বছরের নিরলস পরিশ্রম ও সাধনার ফসল এই নান্দনিক স্থাপনাটি, যেখানে তিনি অতীতের ঐতিহ্যকে বর্তমানের ক্যানভাসে নিপুণভাবে এঁকেছেন।

মসজিদটির স্থাপত্যশৈলীর দিকে তাকালে প্রথমেই যে বিষয়টি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে, তা হলো এর বাহ্যিক কাঠামোর অভিনবত্ব। এটি গতানুগতিক কোনো কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। স্থপতি এখানে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পাথরের ভরের বা কাঠামোর সমন্বয় ঘটিয়েছেন। স্থপতি জাসিম আল-সাদ্দাহের এই নকশা কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল এক সুচিন্তিত ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তিনি এই পাঁচটি কাঠামোর অবতারণা করেছেন। একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এই জ্যামিতিক আকারগুলো যেন মুমিনের জীবনের মূল পাঁচটি ভিত্তিরই প্রতিনিধিত্ব করছে। এই পাঁচটি খণ্ড যেমন একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইমারত তৈরি করেছে, ঠিক তেমনি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভও একটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম জীবনের প্রতিচ্ছবি।

মসজিদটির নামকরণের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় এর নকশায় ব্যবহৃত ল্যানসেট বা বর্শার ফলার মতো খিলানগুলোর ব্যবহারে। মিসরের মামলুক সাম্রাজ্যের স্থাপত্যরীতি দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থপতি এই ল্যানসেট আর্চ বা খিলানগুলোকে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। জানালা, দরজা ও ভবনের বিভিন্ন কাঠামোগত উপাদানে এই খিলানগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে। মসজিদের নকশার এই ছন্দময়তা মুসল্লিদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি ও একাগ্রতা তৈরি করে।

মসজিদের প্রধান প্রবেশদ্বারে স্থাপন করা হয়েছে একটি বিশাল কাঠের দরজা। দরজার নকশা ও অবস্থান এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, তা আপনা-আপনিই দর্শনার্থীর দৃষ্টিকে নিয়ে যায় মসজিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ গম্বুজের দিকে। তবে এই গম্বুজটি প্রচলিত মসজিদের গম্বুজের মতো নয়। এখানেও স্থপতি দেখিয়েছেন তার সৃজনশীলতার স্বাক্ষর। পূর্ণ গম্বুজের পরিবর্তে তিনি তৈরি করেছেন একটি অর্ধ-গম্বুজ, যা চাঁদের আকৃতির মতো। এই অর্ধ-গম্বুজটি যেন বিনয়ের সঙ্গে আকাশের পানে তাকিয়ে আছে। মসজিদের মিনারটিও বেশ রাজকীয় ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান। এটি ওপর থেকে সোজাসুজি নেমে এসেছে একেবারে ভেতরের মিহরাব পর্যন্ত, যা মসজিদের বাইরের জগত আর ভেতরের আধ্যাত্মিক পরিবেশের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু বন্ধন তৈরি করেছে।

মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আচ্ছন্ন করে ফেলে মনকে। ভেতরে পিলারের আধিক্য নেই, যা দৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশাল ও উন্মুক্ত স্থান। এই বিশালত্ব যেন মানুষের ক্ষুদ্রতা এবং মহান রবের বিশালত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভেতরের সাজসজ্জায় বাহুল্য বর্জন করা হয়েছে। ছিমছাম এবং শান্ত পরিবেশ বজায় রাখার জন্য স্থপতি ধূসর পাথর এবং সাদা মাটির রঙের ব্যবহার করেছেন। এই রঙগুলো মামলুকি আমলের কথা মনে করিয়ে দিলেও এর উপস্থাপনা সম্পূর্ণ আধুনিক। এই সাদামাটা এবং পবিত্র আবহ মুসল্লিদের মনে প্রশান্তি ও নিরাপত্তা বোধ জাগিয়ে তোলে।

দিনের বেলা কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। এখানে ওপরের দিক থেকে সূর্যের আলো সরাসরি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে, যা নুরের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রাকৃতিক আলোয় মসজিদের ভেতরের দেয়ালগুলোতে খোদাই করা কোরআনের আয়াতগুলো ঝলমল করে। ক্যালিগ্রাফিগুলো প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে কিছুটা বড় এবং আধুনিক রীতিতে খোদাই করা হয়েছে, যা দেয়ালের গায়ে এক অপূর্ব ত্রিমাত্রিক আবহ তৈরি করে। আলোর খেলায় এই আয়াতগুলো কখনো উজ্জ্বল, কখনো বা ছায়ায় রহস্যময় হয়ে ওঠে।

মামলুকি ল্যানসেট মসজিদটি নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থপতি জাসিম আল-সাদ্দাহের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। তিনি চেয়েছিলেন এমন কিছু তৈরি করতে, যা আরব ঐতিহ্যের শেকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখবে, আবার একই সঙ্গে সমসাময়িক সময়ের চাহিদাও পূরণ করবে। তার মতে, স্থাপত্যশিল্পে নতুন কিছু সৃষ্টির আগে নিজের শেকড়ে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। আরব ঐতিহ্যের গভীরতা এবং সমৃদ্ধি যেকোনো স্থপতির জন্যই এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস। এই মসজিদটি সেই দর্শনেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি এমন এক স্থাপত্যকর্ম, যা মানুষকে তার অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটাতে সাহায্য করে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার