বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে চলছে নানা নাটকীয়তা

নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর ও বন্দর) আসনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে চলছে নানা নাটকীয়তা। এ আসনে প্রাথমিক তালিকায় মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার ৩ দিনের ব্যবধানে ফিরে আসার নাটকের রেশ শেষ হতে না হতেই এবার মিলল নতুন প্রার্থীর খবর। এবার এ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। তাকে গত শুক্রবার দলীয় কার্যালয়ে ডেকে আসনটিতে নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য বলা হয়েছে বলে জানান তিনি। গতকাল শনিবার দলীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বলেও জানান তিনি। এ ছাড়াও গতকাল সন্ধ্যায় তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশী অপরাপর প্রার্থীদের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। সাখাওয়াত বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দাবি করে তার সমর্থকরা বিভিন্ন স্থানে মিষ্টিও বিতরণ করেন। অপরদিকে প্রাথমিক তালিকায় নাম থাকায় মাসুদুজ্জামান মাসুদ তার ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেছেন অফিসিয়াল নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত দলের প্রার্থিতা অপরিবর্তিত রয়েছে। কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

এদিকে সাখাওয়াত গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে আমাকে গতকাল (শুক্রবার) নির্বাচন করার কথা বলেছে। আমি আজ (শনিবার) নমিনেশন পেপার নিয়ে আসছি। দল আমার ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে আমি তা যথাযথভাবে পালন করব ধানের শীষকে বিজয়ী করে আনার মাধ্যমে। আশা করি, বন্দর ও নারায়ণগঞ্জের মানুষ রাজপথে আমার আন্দোলন-সংগ্রাম বিবেচনা করে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করবে। আমাকে দল আজ প্রার্থী হিসেবে প্রশিক্ষণও দিয়েছে। আমিসহ এ প্রশিক্ষণে ১০০ জন প্রার্থী ছিলেন। এর আগে আরও ২০০ জন প্রার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে’, যোগ করেন সাখাওয়াত।

জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ছিলেন মাসুদুজ্জামান মাসুদ। তিনি এর আগে থেকেই এলাকায় গণসংযোগ, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। তবে তার প্রার্থিতা পরিবর্তনের দাবিতে একাট্টা হয়েছিলেন এ আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, মহানগর বিএনপি নেতা ও সমাজসেবক প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবু জাফর আহাম্মেদ বাবুল এবং মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।

এদিকে গত ১৬ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

মাসুদুজ্জামান বলেন, আপনাদের অনেকেরই মন ভেঙে যাবে। আমি আসলে নির্বাচন করব না। আমি উদ্বিগ্ন। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি জানি, এটা কী পরিমাণ কষ্ট আপনাদের জন্য, আশার জায়গা ছিল আশাহত হতে হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার জন্য সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত কারণ এবং কিছু পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে আমাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাকে ক্ষমা কওে দেবেন। একজন সমাজকর্মী হিসেবে আজীবন আপনাদের পাশে থাকব। আমি জানি কী কাজ করতে যাচ্ছি। এটা অনেকেরই কাছে তীরে এসে ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমার কাছেও এটা মনে হচ্ছে। অনেকেরই বুক ফেটে যাচ্ছে। আমার সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা নেই।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি আমার পরিবারকে সময় দিতে পারি না। অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় কিন্তু নির্বাচনের কারণে আমি যেতে পারি না। আমার পরিবার চাচ্ছে না। আমার পরিবারের সদস্যরা ব্যথিত এবং ভীত। এর বাইরেও কিছু নিরাপত্তা ইস্যু আছে। এটা বিশদ বর্ণনা দেওয়ার মতো নয়। পরিবেশটাই নেতিবাচক। সবকিছু বিবেচনা করে আমি নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এদিকে নিরাপত্তা ইস্যুতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও তিন দিন নাটকীয়তার পর আবারও নির্বাচনে থাকার ঘোষণা দেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ। গত ১৯ ডিসেম্বর বিকেলে ফতুল্লার তল্লায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নেতাকর্মীদের সামনে তিনি ওই ঘোষণা দেন। এর আগে নেতাকর্মীরা সেখানে মিছিল সহকারে যোগ দেন। আগে থেকেই কারখানাতে উপস্থিত ছিলেন মাসুদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। সেটা হতে সরে এসেছি। আমি নির্বাচন করব। আপনারা আমার পরিবার, আপনারাই আমাকে নিরাপত্তা দেবেন।’

এদিকে মাসুদুজ্জামানের নির্বাচনে ফেরার এই ঘোষণার পরদিনই সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছেন, তিনি দলটি থেকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে প্রার্থী হচ্ছেন। মাসুদুজ্জামানের নাটকীয়তার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বলে দাবি করেন। তিনি নিজের ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত একাধিক পোস্টও করেন। ফেসবুকে একটি পোস্টে দেখা যায়, সাখাওয়াত হোসেন খানের নামে একটি জামানতের রসিদ।

এরপর থেকে তার অনুগামী মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ মিছিলসহ উল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন। সন্ধ্যায় অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু এবং মহানগর বিএনপির নেতা বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিল্পপতি আবু জাফর আহাম্মেদ বাবুলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন।

উল্লেখ্য, সাখাওয়াত হোসেন খান ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাতখুনের ঘটনার পর বাদীপক্ষের আইনজীবী হয়ে আলোচনায় আসেন। এ আইনজীবী ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে সারা দেশে পরিচিতি পান। এ পরিচিতি তাকে ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন পেতে সহযোগিতা করে। যদিও ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করা সাখাওয়াত। পরে ২০১৮ সালেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির এ নেতা। কিন্তু সেবার তিনি মনোনয়ন পাননি।