পিটিয়ে হত্যার পর লাশে আগুন ১০ জন গ্রেপ্তার

ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দিপু চন্দ্র দাস (২৭) নামে এক পোশাক কারখানার শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনায় দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকা- দাবি করেছে। এ ঘটনায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১৪) ও ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

হত্যাকা- ও মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শনিবার ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। র‌্যাব প্রধান অভিযুক্তসহ সাতজনকে এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশ পৃথক অভিযানে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত সাতজন হলেন মো. লিমন সরকার (১৯), মো. তারেক হোসেন (১৯), মো. মানিক মিয়া (২০), এরশাদ আলী (৩৯), নিজুম উদ্দিন (২০), আলমগীর হোসেন (৩৮) ও মো. মিরাজ হোসেন আকন (৪৬)।

গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে গ্রেফতারকৃত তিনজন হলেন মো. আজমল হাসান সগীর (২৬), মো. শাহিন মিয়া (১৯) এবং মো. নাজমুল (২১)।

পুলিশ ও র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতে পাঠানো হবে। তদন্তের স্বার্থে রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া এলাকার ‘পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড’ কারখানার ভেতরে দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে কারখানার শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কারখানার নিরাপত্তাকর্মীরা দিপুকে বাইরে পাঠিয়ে দেন। পরে বিক্ষুব্ধ জনতার মারধরে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। এরপর তার মরদেহ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গাছে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাতের দিকে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে তা ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

নিহত দিপু চন্দ্র দাস তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়নের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিলেন এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ডিগ্রি পাস করার পর ২০১৮ সালে চাকরিতে যোগ দেন। তার স্ত্রী মেষলা রানী দাস ও দুই বছরের এক কন্যাসন্তান রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম সৃষ্টি হয়। দিপুর বাবা রবি চন্দ্র দাস বলেন, তার ছেলে ধর্ম অবমাননার মতো কোনো কাজ করতে পারে না। কর্মস্থল-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দিপুকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

দিপুর স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এখন ছোট সন্তানকে নিয়ে কীভাবে চলব, জানি না।

এদিকে, এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই তপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা প্রায় ১৫০ জনকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেন একজনকে পুলিশের হাতে না দিয়ে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হলো, তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।