গানে গানে ছায়ানটে হামলার প্রতিবাদ জানালেন সংস্কৃতিকর্মীরা। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে একের পর এক দেশাত্মবোধক গানে এক আবেগসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল ছায়ানটের সামনের রাস্তা। বিকেল সাড়ে ৩টার পর থেকেই দলে দলে মানুষ আসতে থাকে ছায়ানটের দিকে, কারও পরনে লাল-সবুজ, কারও আবার কালো শাড়ি কালো চাদর আর কালো আলোয়ান। ৪টার মধ্যেই লোকসমাগমের কারণে ছায়ানটের সামনের পাশের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শান্তিপূর্ণভাবে উপস্থিত শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি অনুরাগীরা ছায়ানটের আগের দিনের ঘোষণা অনুযায়ী একের পর এক গান সম্মিলিত কণ্ঠে গাইতে থাকেন। এ সময় অনেককে আবেগে ভেসে যেতে দেখা যায়, অশ্রুপাত করতে দেখা যায়। ছায়ানটের এ আয়োজনে গাওয়া হয় মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম মোরা ঝর্ণার মতো চঞ্চল, ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি, চল চল চল ঊর্ধ গগনে বাজে মাদল, ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে, আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ঐ আকাশে, গেরামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম/আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, মানুষ ছাড়া ক্ষেপা রে তুই মূল হারাবি মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ হ’মানুষ হ’ আবার তোরা মানুষ হ, তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে, হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ এবং আমার প্রতিবাদের ভাষা আমার প্রতিরোধের আগুন।
মিরপুর-২ থেকে আসা আশফাকউজ্জামান যেমন বলছিলেন গানগুলো নিয়ে, ‘দেখুন, এ গানগুলোই তো বাংলাদেশের গান, এখানে রবীন্দ্রনাথ শুধু নয়, নজরুল আছেন, সুকান্ত আছেন, সলীল চৌধুরী আছেন আবার আমাদের লোকগানের সম্রাটদের গান আছে। এসব গান আমাদের এ দেশকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতেই শেখায়। ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি উপস্থিত হাজারো মানুষকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন, ফেসবুক ইউটিউবের মাধ্যমে সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ আয়োজন শেয়ার করেছেন বলে, ছায়ানটের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করেছেন বলে কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এবং সাম্প্রতিককালে দেশের বাউলসমাজের ওপরও একটি মহল সহিংস আক্রমণ চালিয়েছে। সেই সঙ্গে তারা বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে আবহমান বাংলা সংস্কৃতি চর্চা থেকে আমাদের নিবৃত্ত করতে উদ্যত। এসব কর্মকাণ্ড বাঙালি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির ওপরে আঘাত হানছে। গণমাধ্যমের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে চলা শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত নিরপরাধ হত্যা দেশবাসীর নিরাপত্তা বিপন্ন করছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মোদ্যোগ গ্রহণ জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় সমাজকে সক্রিয় করে তুলবে।’ তিনি আরও বলেন, ছায়ানট নিরাপত্তাহীনতার অবসান চায়, চায় বাঙালির সংস্কৃতির যাত্রাপথ নির্বিঘœ হোক।
ধানমণ্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের সামনে ‘গানে গানে সংহতি-সমাবেশ’-এ অংশ নেন দেশের প্রথিতযশা শিল্পী, সাহিত্যিক, নালন্দা বিদ্যালয়ের অভিভাবকসহ বিভিন্ন বয়সী নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, তারা সবাই গলা মিলিয়ে গান গেয়ে প্রতিবাদ জানান এ আয়োজনে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার পাশাপাশি হামলা হয় ছায়ানট ভবনেও। হামলায় গুঁড়িয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন শিল্পকর্ম, বাদ্যযন্ত্র, সংগীতের উপকরণসহ পুরনো দস্তাবেজ, বই, শিশুদের ব্যবহৃত পরীক্ষার খাতা। আয়োজনের শেষদিকে ঘোষণা দিয়ে সম্মিলিতভাবে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়, এ সময় আবেগরুদ্ধ হয়ে পড়ে অনেকের কণ্ঠ। অনেককে চোখ মুছতেও দেখা যায়। শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয় গানে গানে প্রতিবাদ ও সংহতির এ সমাবেশ।