মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস-শিল্প-সাহিত্য ও প্রাকৃতিক খনিজসমৃদ্ধ দেশ ইরাক গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক খরার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে এখন পানির জন্য চলছে হাহাকার। আর সেই সংকট কাটাতে তুরস্কের সঙ্গে এক বিতর্কিত চুক্তির পথে হাঁটছে ইরাক সরকার। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। যে দুই বিশ্বখ্যাত নদীর (দজলা ও ফোরাত) দেশ হিসেবে ইরাকের পরিচিতি সেই নদী দুটিই আজ মরতে বসেছে, এর অস্তিত্ব বিলীনপ্রায়। প্রাকৃতিকভাবেই খরার কারণে শুকিয়ে যাচ্ছে দেশটির একদা প্রমত্ত এই দুই নদী। তবে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মানবসৃষ্ট কারণও নদীগুলোর উজানে বাঁধের পর বাঁধ। ফোরাতকে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার তথা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘতম নদী হিসেবে উল্লেখ করে ব্রিটানিকা বলছে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। তুরস্কে জন্ম নিয়ে ফোরাত নদী সিরিয়া হয়ে ইরাকে ঢুকেছে। তারপর ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল বসরায় দজলার সঙ্গে মিশে ‘শাত আল-আরব’ নাম নিয়ে পড়েছে পারস্য উপসাগরে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক সময় প্রাচুর্যের প্রতীক দজলা ও ফোরাতকে বাঁচিয়ে রাখতে মরিয়া ইরাক সরকার। এই দুই নদীর উৎস আজকের তুরস্কে। তাই তেলের ঘাটতিতে থাকা তুরস্ককে পানির ঘাটতিতে থাকা ইরাক যে প্রস্তাব দিতে চায় তা হচ্ছে ‘তেলের বিনিময়ে পানি’। এই নদীর ওপর তুরস্ক ও সিরিয়া একাধিক বাঁধ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইরাকে দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সেচ ব্যবস্থাগুলো অনেকটাই অকেজো। সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অক্ষমতার কারণে সেগুলো এখন গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে ইরাকের ৪ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ যখন পানির চরম সংকটে তখন নেমে এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খরা। আবার, নদী তীরবর্তী শহরগুলোয় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পানির চাহিদা। দেশটির পানিসম্পদের ৮০ শতাংশের বেশি খরচ হয় চাষাবাদের কাজে। নদীটির ইরাক অংশে যেসব বাঁধকেন্দ্রিক জলাধার আছে তীব্র খরার কারণে সেগুলোর পানি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে বলে সম্প্রতি দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। ইরাকি পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও ইরাকি গ্রিন ক্লাইমেট অর্গানাইজেশনের প্রধান মুখতার খামিস সিএনএন-কে জানান, তুরস্কে নদী দুটির উজানে নির্মিত বাঁধগুলো ইরাকে পানির প্রবাহ ব্যাপকহারে কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ইরাকে পানির চলমান সংকট আরও বেড়েছে। ইরাকের কৃষি সমিতিগুলোর ফেডারেশন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পানি স্বল্পতার কারণে বেশ কয়েক হাজার কৃষক চাষাবাদ ছেড়ে জীবন ধারণের জন্য অন্য কাজ করছেন।
তেলের বিনিময়ে পানি
ইরাকের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মুখতার খামিসের মতে, ইরাকের পানির প্রায় ৬০ শতাংশ আসে তুরস্ক থেকে। আগের বছরগুলোর তুলনায় সম্প্রতি সেই পানির প্রবাহ কমেছে। অন্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পানির সংকট অনেক তীব্র হওয়ায় ইরাক সরকার তুরস্কের সঙ্গে বিতর্কিত সহযোগিতা চুক্তি করতে যাচ্ছে। সিএনএন জানিয়েছে, গত নভেম্বরে ইরাক ও তুরস্ক একটি বহু শত কোটি ডলারের ‘ওয়াটার কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর রূপরেখা উপস্থাপন করে। চুক্তি অনুসারে, তুরস্কের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইরাকের পানির সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণ বাড়াতে নতুন অবকাঠামো তৈরি করবে। এর খরচ মেটানো হবে ইরাকের অপরিশোধিত তেল বিক্রির টাকা থেকে। অর্থাৎ, তেলের বিনিময়ে হলেও ইরাকের পানি নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির পানি-বিষয়ক উপদেষ্টা তোরহান আল-মুফতি গণমাধ্যমকে জানান, ইরাক প্রতিদিন চুক্তি অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বিক্রি করবে। সেই টাকা একটি তহবিলে জমা হবে। সেখান থেকে পানি প্রকল্পের অবকাঠামোর খরচ বাবদ তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার তৈরি ও নদীখনন করা হবে।
তবে এ চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। বাগদাদের পানি বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিক শুরুক আলাবায়াচির বিশ্বাস, পানি কোনো বাজারি পণ্য নয়। এটা মানুষের অধিকার। তুরস্কের সঙ্গে এই চুক্তিকে তিনি পানি-কূটনীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা থেকে দূরে সরে যাওয়া বলে অভিহিত করেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডলইস্ট ইনস্টিটিউটের তুর্কি প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গওনুল তোল মনে করেন, এই চুক্তি তুরস্কের পক্ষে গেছে। ইরাকের চরম দুর্দশার সুযোগ নিয়ে এর সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ওপর হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। তার মতে, সস্তায় পাওয়া ইরাকি তেল দিয়ে এরদোয়ান তুরস্কের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ২০২৮ সালের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাচ্ছেন; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে আসা রুশ তেল না কেনার অনুরোধ রক্ষা করতে পারছেন।