চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী সরওয়ার হোসেন বাবলা হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তারের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরলেও মোস্ট ওয়ান্টেড রাউজানের সেই ‘সন্ত্রাসী’ মোহাম্মদ রায়হান (৩৫) এখন ভারতে অবস্থান করছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
গত ৫ নভেম্বর বিকেলে নগরের চালিতাতলী এলাকায় বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে ‘সন্ত্রাসী’ সরওয়ার হোসেন বাবলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলার অন্যতম আসামি মোহাম্মদ রায়হান।
‘সন্ত্রাসী’ রায়হানের ঘনিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাবলা হত্যাকাণ্ডের পরপরই রামগড় সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যান রায়হান। তবে তার ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হলো বর্তমানে ভারতের একটি রাজ্যে অবস্থানরত রাউজানের আরেক ‘সন্ত্রাসী’ ১২ মামলার আসামি আজিজুল হককে (৫৫) হত্যা করা। গত বছরের ২৫ নভেম্বর রাউজানে এক ওমান প্রবাসীর বাড়ি পোড়ানোর মামলায় চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা এলাকায় র্যাব-৭ এর হাতে গ্রেপ্তার হন আজিজুল হক। প্রায় ছয়মাস পর জামিনে মুক্ত হয়ে রায়হানের ভয়ে এলাকা ছেড়ে আজিজুল পালিয়ে যান ভারতে।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে বলেন, ‘বাবলা হত্যাকাণ্ডের পর পর সন্ত্রাসী রায়হান ভারতে চলে যাওয়ার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আরেক সন্ত্রাসী আজিজুল হককে খুন করতেই সন্ত্রাসী রায়হানের ভারত যাওয়ার বিষয়েও কিছু জানা নেই। তবে এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
পুলিশ সূত্র জানায়, এক সময় পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ রায়হান। এর আগে ছদ্মবেশে চোলাই মদ বিক্রি করতেন তিনি। রাউজানে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ নানা বিষয় নিয়ে আজিজুলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান রায়হান।
রায়হানের ঘনিষ্ঠ সূত্রটির দাবি, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের আগে অত্যাধুনিক একটি একে-৪৭ রাইফেল সরবরাহ করার বিনিময়ে রায়হানের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেন আজিজুল। কিন্তু রায়হানের সেই টাকা মেরে দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আত্মগোপন করেন আজিজুল। মূলত এরপর থেকে আজিজুলকে খুন করার পরিকল্পনা করে রায়হান। গত এক বছরের ব্যবধানে রাউজান ও নগরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত চাঞ্চল্যকর ৮টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসায় খোদ আজিজুল হকসহ আরও রাউজানের অনেক সন্ত্রাসীর কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠে রায়হান। তবে রায়হান ও আজিজুল এখন ভারতের ঠিক কোন রাজ্যে অবস্থান করছেন সেটি নিশ্চিত করতে পারেনি সূত্রটি।
‘সন্ত্রাসী’ আজিজুল হক বর্তমানে নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে এলাকায় পরিচয় দেন। তার আজিজুলের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণসহ ১২টির বেশি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব-৭। আজিজুল ডাবুয়া ইউনিয়নের উত্তর হিংগলা গ্রামের বাসিন্দা। তবে একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। ২০০৬ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যের ওমানে পালিয়ে যান তিনি। গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি দেশে এসে আবারও ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টায় ছিলেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এদিকে হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে সন্ত্রাসী রায়হানের সঙ্গে পরিচয় হয় ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের। এক বছরেরও বেশি সময় আগে জামিনে বের হয়ে এসে ভয়ংকর হয়ে ওঠেন রায়হান।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর রায়হানের নামে নগর ও জেলায় যুক্ত হয়েছে জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৮টি। সবশেষ গত ৫ নভেম্বর নগরের চালিতাতলী এলাকায় বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে ‘সন্ত্রাসী’ সরওয়ার হোসেন বাবলাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে আসে রায়হানের নাম।
পুলিশ জানায়, হত্যাচেষ্টার মামলায় একাধিকবার কারাগারে যান রায়হান। সেখানে আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দুজনই গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝিতে জামিনে বেরিয়ে আসেন। এরপর চলতি বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে গ্রেপ্তার হন। ফের গ্রেপ্তার হন ছোট সাজ্জাদ।
পুলিশ জানায়, ছোট সাজ্জাদের বাহিনীতে রয়েছেন ২৫ সক্রিয় সদস্য। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর তার বাহিনীর হাল ধরেন পাঁচ সহযোগী, রায়হান, ইমন, খোরশেদ, বোরহান, হাসান (কারাবন্দী)। তাদের মধ্যে অন্যতম সাজ্জাদর ডানহাত হিসেবে পরিচিত রায়হান। তিনি রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নের জোরেরকুল এলাকার মৃত বদিউল আলমের ছেলে।
গত ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানা এলাকার এক্সেস রোডে দুজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় রায়হান জড়িত বলে তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে।
জোড়া খুনের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল হক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘কথায় কথায় গুলি ছোড়েন সন্ত্রাসী রায়হান। তাকে ধরতে একাধিকবার অভিযান চালিয়েও পাওয়া যায়নি। রাউজান ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা করেছেন রায়হান। সেখান থেকে এসে অপরাধ করেন, বিশেষ করে গুলির পর দ্রুত পাহাড়ের নিরাপদ স্থানে চলে যান তিনি।’
পুলিশের দাবি, চট্টগ্রামের রাউজানে গেল এক বছরে সংঘটিত ১২টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে এজাহারভুক্ত ১৪০ জন আসামির মধ্যে একশ’রও বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে করা হয়েছে। হত্যার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দাবি, মূল আসামিদের কেউই গ্রেপ্তার হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হানের নাম উঠে এলেও তিনি রয়ে গেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।