গণমাধ্যম সংস্কারে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ৯ মাসেও কোনো সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের প্রধান ও ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘গত ২২ মার্চ আমরা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দিয়েছিলাম। প্রধান উপদেষ্টা তখন আমাদের বলেছিলেন, ‘এর মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য একটি আলাদা তালিকা করে দেন। তাহলে আমরা সেগুলো অচিরেই বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেব। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই তালিকা করে তার কাছে দিয়ে এসেছিলাম। তিনি সেটি বাস্তবায়নের জন্য কয়েকবার নির্দেশ দিয়েছেন বলে শুনেছি; কিন্তু কিছুই হয়নি।’
গতকাল শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে দেশের সম্প্রচার সাংবাদিকদের সংগঠন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) ষষ্ঠ সম্প্রচার সম্মেলনে এসব কথা বলেন কামাল আহমেদ।
তিনি বলেন ‘আমাদের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাব, তার একটি প্রস্তাবও এ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে, এমন কথা আমি বলতে পারছি না। এ জন্য আমি দুঃখিত।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা হিসেবে সদ্য দায়িত্ব পাওয়া সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় কামাল আহমেদ উপদেষ্টার উদ্দেশে বলেন, ‘তার (সৈয়দা রিজওয়ানা) ঘাড়ে হয়তো দোষ চাপানো যাবে না; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে তো দোষ চাপানো যাবে। অন্তর্বর্তী সরকার যে কিছুই করেনি, এটাই হচ্ছে সত্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মাঝখানে খুব ব্যস্ততা দেখিয়েছেন, এই সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে তারা কাজ করছেন। সে কাজটি কী হয়েছে, কাজটি হয়েছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর আর বিভাগের কাছে মতামতের জন্য পাঠিয়েছে। তারা নানা মতামত দিয়েছেন। মতামত হচ্ছে, এগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে না।’ বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) একীভূত করে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান করার সুপারিশের কথা উল্লেখ করে কামাল আহমেদ বলেন, সেই উদ্যোগও সরকার নিতে পারেনি।
কামাল আহমেদ বলেন, উপদেষ্টাদের নিয়ে দুবার দুটি কমিটি করা হলো। একবার শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরারকে (সি আর আবরার) আহ্বায়ক করে। আরেকবার পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে। ফলাফল হচ্ছেকিছু করা যাবে না।
‘এখন আর সময়ও নেই’ উল্লেখ করে কামাল আহমেদ বলেন, ‘এটা হচ্ছে হতাশা ও ক্ষোভের কারণ। চাইলে সরকার করতে পারত, অন্তত এক কুড়ি সুপারিশ শুধু একটা নির্দেশনা জারি করেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে গণমাধ্যমের ওপর হামলা কিছু মহল তাদের কুক্ষিগত স্বার্থের জন্য করে বলে মন্তব্য করেন তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
অনুষ্ঠানে অন্য অতিথিদের বিভিন্ন দাবি ও আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য উপদেষ্টা তার দেড় মাসের মেয়াদ থাকার কথা তুলে ধরে বলেন, এই দেড় মাসে দুটো কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। একটা কাজ হচ্ছে সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ জারি। দ্বিতীয়টি হলো প্রেস কমিশন অধ্যাদেশ জারি। তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার যেন চূড়ান্ত করা যায়, সেটারও দ্রুততার সঙ্গে চেষ্টা করা হবে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন ‘পরিষ্কারভাবে আমরা জানি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, ছায়ানটকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য এক দিন আগে, দুই দিন আগে থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কারা ঘোষণা দিয়েছে, এ দেশের সব মানুষ জানে, সরকারও জানে। বাংলাদেশের যেকোনো আইনে...ফৌজদারি অপরাধ। সরকার তো তাদের গ্রেপ্তার করে নাই আগেই প্রিভেন্ট করার করার জন্য। তারা তো আগেই ঘোষণা দিয়েছে, এগুলোকে ধ্বংস করা হবে। এ কারণেই আমরা বলেছি সরকারের কোনো না কোনো অংশ এই ঘটনাটা ঘটতে দিয়েছে।...তাহলে সংগঠিত একটি শক্তি ওইখানে গিয়ে এই কাজ করেছে। ইতিমধ্যে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে পরিষ্কারভাবে রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজে পাওয়া গেছে।’
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, যারা এই আগুন দিয়েছে, তারা যেমন গণমাধ্যমের প্রতিপক্ষ, তেমনি সরকারেরও প্রতিপক্ষ। আপনার যদি কারও মতামত পছন্দ না হয়, আপনি ভিন্নমতের একটা পত্রিকা খোলেন, আপনার পত্রিকাকে আপনি জনপ্রিয় করে তোলেন, আপনি সেটা না করে পত্রিকায় আগুন লাগিয়ে দেবেন, আর মনে করবেন আপনার সমস্যা সমাধান হয়ে গেল, এটা তো হতে পারে না।’
ভয় যারা দেখাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘ভয় কী আমাকে দেখায়নি? আপনারা তো এটা জানেন, আমার বাসার সামনেও ককটেল ফাটানো হয়েছে। অর্থাৎ ভয় যারা দেখাচ্ছে, তারা কিন্তু আমাদের কমন প্রতিপক্ষ। এই কমন বা অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যদি আমাদের লড়াই করতে হয়, লড়াই তো করতেই হবে এবং জিততে হয়, তাহলে একটা কথা বলব...একজন আরেকজনকে প্রতিপক্ষ মনে করে কোনো কাজ হবে না।’
সাংবাদিক শাহনাজ শারমিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিজেসির উপদেষ্টা খায়রুল আনোয়ার, বিজেসির চেয়ারম্যান ও মাছরাঙা টিভির প্রধান সম্পাদক রেজোয়ানুল হক, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিজেসির ট্রাস্টি ফাহিম আহমেদ, বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের প্রতিনিধি মো. আল মামুন, সাংবাদিক তালাত মামুন, ইলিয়াস হোসেন, মিল্টন আনোয়ার প্রমুখ।
সম্মেলনে সাংবাদিক নেতারা বলেন, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন নেই বলেই গণমাধ্যম হামলার শিকার হয়েছে। আগামী সরকারের কাছ থেকে সব দাবি-দাওয়া আদায় করতে গণমাধ্যমকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
সম্মেলনে সাংবাদিকতার নীতি উন্নয়ন, সাংবাদিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
গণমাধ্যমকর্মীরা বলেন, সব আমলেই গণমাধ্যমকে সংবাদ প্রচারে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, ভয়-ডরহীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রটা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিজেসির সম্প্রচার সম্মেলনে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।