লড়াই হবে জামায়াত-বিএনপির

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একাধিক আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে বলে ধারণা করছে রাজনৈতিক মহল। এ ছাড়া জেলার পাঁচটি আসনেই বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে জামায়াত। এ আসনগুলোতে বিএনপির অনেক আগেই দলটি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচারণার কাজ এগিয়ে রেখেছে। আর গাজীপুর-৬ আসন নিয়ে আইনি জটিলতা ও দলীয় অনৈক্যের কারণে মনোনয়ন ঘোষণা বিলম্ব করে বিএনপি।

এরই মধ্যে গাজীপুর-২ আসনে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাহউদ্দিন সরকার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তাহলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পাঁচটি আসনেই তাদের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, জনতার দলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এবারের সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন গাজীপুরে ভোটারের সংখ্যাধিক্য বিবেচনা করে একটি আসন বৃদ্ধি করেছিল। গাজীপুর-২ আসন পুনঃবিন্যস্ত করে টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানা এবং গাছা থানা নিয়ে গাজীপুর-৬ আসন করা হলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে এ আসন বৃদ্ধি বাতিল করা হয়। ফলে গাজীপুর-২ নির্বাচনী আসন আগের অবস্থাতেই বহাল থাকে।

গত ৩ নভেম্বর গাজীপুরের চারটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপি। ওই সময় গাজীপুর-১ আসনের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। আর আইনি জটিলতার কারণে নতুন করে বিন্যস্ত গাজীপুর-৬ আসনেও প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। পরে গত ৫ ডিসেম্বর গাজীপুর-১ আসনে কালিয়াকৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র মজিবুর রহমানকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। আর উচ্চ আদালতের রায়ে গাজীপুর-৬ আসন বাতিল হওয়ায় এ আসনটি গাজীপুর-২ আসনের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হয়ে যায়। গাজীপুর-২ আসনে গত ৩ নভেম্বরই মনোনয়ন দেওয়া হয় সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র প্রয়াত অধ্যাপক এমএ মান্নানের ছেলে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম. মঞ্জুরুল করিম রনিকে। তিনি এ আসনের শক্তিশালী প্রার্থী।

গাজীপুর-১ আসন : গ্রাম ও শহর নিয়ে গঠিত এ আসনে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হন। এবারের নির্বাচনে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় কোথাও তাদের কোনো প্রার্থী নেই। এবার এ আসনটি পেতে চায় বিএনপি। সেজন্য দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কালিয়াকৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র মজিবুর রহমানকে। তিনি মনোনয়ন পেয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় সাবেক সচিব শাহ আলম বকশীকে। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে তার নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মো. রুহুল আমিন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এ আসনটি জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হতে পারে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। বিএনপির প্রার্থী মজিবুর রহমান প্রায় দুই যুগ ধরে কালিয়াকৈর পৌরসভার প্রশাসক ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এলাকায় রয়েছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মো. শাহ আলম বকশী সরকারের সাবেক সচিব থাকায় তিনিও এলাকায় জনপ্রিয়। জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শফিকুল ইসলাম বাবুল।

কালিয়াকৈর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বাসন, কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর থানা নিয়ে এ আসন গঠিত। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৭ লাখ ২০ হাজার ৯৩৭ জন।

গাজীপুর-২ আসন : জেলার সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন গাজীপুর-২। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৯ থেকে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং ৪৩ থেকে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত (টঙ্গী পূর্ব, পশ্চিম ও গাছা থানা) নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনি। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তিনি তুলে ধরছেন বিএনপির ৩১ দফা, আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে সেই ভাবনা। গাজীপুরে তার বাবা ও সাবেক মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নানকে বলা হয় উন্নয়নের রূপকার। বাবার ইমেজ ও জনপ্রিয়তা কাজে লাগানো এবং তার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার অঙ্গীকার নিয়ে রনি কাজ করে যাচ্ছেন।

এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন দলটির মহানগর কমিটির নায়েবে আমির হোসেন আলী। তিনি দীর্ঘদিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। তারা পরিবর্তনের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ ছাড়া এই আসনে এসসিপি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতা আলী নাসের খান। এদিকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি সালাহউদ্দিন সরকার এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এ আসনে বহিরাগত ও শ্রমিক ভোট জয়-পরাজয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখানে স্থানীয় ভোটের চেয়ে বহিরাগত জেলা থেকে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী ভোটার সংখ্যা বেশি। এখানে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি শক্তিশালী হলেও জামায়াতও সুসংগঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন।

গাজীপুর-৩ আসন : এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তিনি নির্বাচনী এলাকায় অনেক আগ থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে গাজীপুরে তার ব্যাপক খ্যাতি রয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির অর্ধডজন প্রার্থী থাকলেও তারা এখন সবাই মিলেমিশে ডা. রফিকুলের পক্ষে কাজ করছেন। এতে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন তিনি।

এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জেলা শাখার আমির ড. জাহাঙ্গীর আলম। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এ আসনে প্রার্থী হাফেজ মাওলানা আলমগীর হোসাইন। বিএনপির সাবেক নেতা ও গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইজাদুর রহমান মিলন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এ আসনটিও শিল্প ও গ্রাম এলাকা নিয়ে গঠিত। স্থানীয় এবং বহিরাগত শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা জয়-পরাজয়ের ভূমিকা রাখবেন বলে স্থানীয়দের অভিমত। শ্রীপুর উপজেলা, গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর, ভাওয়াল গড় ও পিরুজালী ইউনিয়ন এবং গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৩ আসন। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৯ জন।

গাজীপুর-৪ আসন : এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ রিয়াজুল হান্নান। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য প্রায়ত মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহর ছেলে। জামায়াতে ইসলামী এ আসনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছে। প্রার্থীরা এলাকায় ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন এবং নিজ নিজ দলের প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করছেন।

এ আসনে সবসময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো। এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর। ভোটের পরিসংখ্যানে এখানে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে জামায়াতের প্রার্থী সালাউদ্দিন আইয়ুবী তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবেন বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। এ আসনটিতে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। তবে বিএনপিতে দলীয় কিছু কোন্দল থাকলেও তা নির্বাচনে তেমন প্রভাব ফেলবে না বলে জানান দলের নেতাকর্মীরা।

কাপাসিয়া একটিমাত্র উপজেলা নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৪ আসন। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজার ৯৭৭ জন।

গাজীপুর-৫ আসন : এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হক মিলন। তিনি গতকাল সোমবার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন গাজীপুর মহানগর শাখার নায়েবে আমির ও কালীগঞ্জ ফোরামের সভাপতি খায়রুল ইসলাম। এ আসনে নতুন রাজনৈতিক দল জনতার দলের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আজম খানও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।

জামায়াত জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে এ আসনটি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী গাজী আতাউর রহমানকে ছেড়ে দিতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এ আসনে বিএনপির কোনো দলীয় কোন্দল নেই। ফজলুল হক মিলন দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক এমপি এবং এক সময়ের তুখোড় ছাত্রদল নেতা। তিনি এখানে ব্যাপক জনপ্রিয় ব্যক্তি ও সুবক্তা।

এ আসনে জনতার দলের আজম খানও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। এলাকায় তিনিও ব্যাপক জনপ্রিয় ব্যক্তি। এ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছেন স্থানীয় ভোটাররা। প্রার্থীরা তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা, গাজীপুর সদরের বাড়িয়া ইউনিয়ন এবং সিটি করপোরেশনের ৪০, ৪১ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর-৫ আসন গঠিত। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৬৪৩ জন।