লড়াই হবে নতুনে নতুনে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কুমিল্লার সংসদীয় আসনগুলোতে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা। প্রায় এক বছর আগে জেলার প্রতিটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী। চলতি বছরের গত ৩ নভেম্বর প্রার্থী ঘোষণার পর বিএনপিও প্রচারে নেমেছে। এর বাইরে বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা নিয়মিত সভা-সমাবেশ, মিছিল ও উঠান বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। 

১৭টি উপজেলা ও ১৮টি থানা নিয়ে গঠিত দেশের অন্যতম বৃহৎ জেলা কুমিল্লায় সংসদীয় আসন রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচটি আসনে এবার লক্ষণীয় কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এসব আসনে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে তিনজনই নতুন মুখ। অন্যদিকে পাঁচটির চারটিতেই প্রথমবারের মতো জামায়াতের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরাসরি প্রার্থী না দিলেও ইসলামী জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্বাচন করছে। বামপন্থি দলগুলোর তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম হলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ইসলামপন্থি দল মাঠে সক্রিয়।

কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) : জেলার মধ্যে চান্দিনায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) শক্ত অবস্থান রয়েছে। শুরুতে বিএনপি এখানে প্রার্থী না দিলেও পরে এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিলে তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।  ড. রেদোয়ান আহমেদ ২০০১ সালে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালেও তিনি বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন। অভিজ্ঞ এই নেতা নিয়মিত সভা-সমাবেশ করছেন। তবে বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আতিকুল আলম ওরফে শাওনের অনুসারীরা মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। 

আতিকুল আলম বলেন, চান্দিনার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ মনে-প্রাণে আমাকে চায়। তাই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। 

অন্যদিকে জামায়াত এ আসনে মাওলানা মোশাররফ হোসেনকে প্রার্থী করেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন মুফতি এহতেশামুল হক কাসেমী। এ আসনে বিএনপির ড. রেদোয়ান আহমেদ, স্বতন্ত্র আতিকুল আলম শাওন, স্বতন্ত্র মাওলানা সালেহ সিদ্দিকী, মুক্তিজোটের সজল কুমার কর, খেলাফত মজলিসের মাওলানা সোলাইমান খাঁন, জামায়াতের মাওলানা মো. মোশাররফ হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি এহতেশামুল হক কাসেমী গত সোমবার মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) : এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক ও দক্ষিণ জেলা সভাপতি জাকারিয়া তাহের (সুমন)। দলে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি না থাকায় তার অবস্থান শক্ত বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে জামায়াত জেলা কর্মপরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ শফিকুল আলমকে প্রার্থী করেছে। ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সাদিক মাহমুদ বিন নূরীও প্রচার চালাচ্ছেন।

এ বিষয়ে শফিকুল আলম বলেন, মানুষ বিশ্বাস করে আমি নির্বাচিত হলে সততার সঙ্গে এলাকার উন্নয়ন করব। এজন্য যেখানে যাচ্ছি, মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।

এ আসনে বিএনপির জাকারিয়া তাহের সুমন, জামায়াতের শফিকুল আলম হেলালের পাশাপাশি জাতীয় পার্টির এইচ এম এম ইরফান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. গোলাম সাদেক, খেলাফত মজলিসের মো. জোবায়ের হোসেন, ইসলামী ঐক্যজোটের আবদুল কাদের, জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম মিলন, বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টির মফিজ উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির গোলাম মোরশেদ ও বাসদের মোহাম্মদ আলী আশরাফ মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। 

কুমিল্লা-৯ (লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ) : বিএনপি প্রথমবারের মতো শিল্পবিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালামকে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু এ আসনে বিএনপির ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে ধারণা সাধারণ মানুষের। অন্যদিকে জামায়াতের একক প্রার্থী দক্ষিণ জেলা সেক্রেটারি সৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী। এ আসনে শক্ত অবস্থান রয়েছে জামায়াতের। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের সেলিম মাহমুদকে এখানে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তৎপরতা নেই এনসিপির। 

আবুল কালাম বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে ৫২টি মামলার আসামি হয়েছি। কিন্তু কখনো নেতাকর্মীদের ছেড়ে যাইনি। সেই ত্যাগের পুরস্কার দল আমাকে দিয়েছে। ইতিমধ্যে দুই উপজেলার মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।

এ কে এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী বলেন, গত ১৭ বছর লাকসামের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভোটের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। আশা করি, মানুষ ইসলামের পক্ষে কাজ করবে। 

এ আসনে বিএনপির আবুল কালাম, স্বতন্ত্র সামিরা আজিম দোলা, রশিদ আহমেদ হোসাইনী, জামায়াতের ড. সৈয়দ এ কে এম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী, জাতীয় পার্টির গোলাম মোস্তফা কামাল, ইসলামী আন্দোলনের সেলিম মাহমুদ, স্বতন্ত্র ইয়াছির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিক, মোহাম্মদ মফিজুর রহমান, মোহাম্মদ আবুল কাশেম, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের আবু বকর সিদ্দিক, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মিজানুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. মাহবুবুর রহমান ও আবদুল হক আমিনী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই) : এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপির সদস্য আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে। তবে কেন্দ্রীয় নেতা মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে তার অনুসারীরা রেলপথ অবরোধসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করেছেন। জামায়াতের প্রার্থী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত। এখানে এনসিপির কোনো কার্যক্রম নেই। 

এ বিষয়ে আবদুল গফুর ভূঁইয়া বলেন, আমার সঙ্গে জনগণের সম্পর্কটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সুখে-দুঃখে সবসময় মানুষের পাশে থাকতে পেরেছি। আশা করছি, ধানের শীষ এখানে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে। কারণ, নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। 

ইয়াসিন আরাফাত বলেন, নতুন হিসেবে যেখানে যাচ্ছি মানুষের সাড়া পাচ্ছি। সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ইসলামের বিজয় হবে, ইনশাআল্লাহ। 

এ আসনে বিএনপির আবদুল গফুর ভূঁইয়া, স্বতন্ত্র মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, মোস্তফা সাজ্জাদ হাসান, জামায়াতের মো. ইয়াসিন আরাফাত, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের কাজী নুর আলম সিদ্দিকী, আম জনতা দলের আবদুল্লাহ আল নোমান, নাগরিক পরিষদের রমিজ বিন আরিফ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের হাসান আহমেদ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. শামছুদ্দোহা মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। 

কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) : ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের। এবার জোট ভেঙে যাওয়ার পর বিএনপি প্রার্থী করেছে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সভাপতি কামরুল হুদাকে। এটি তার প্রথম সংসদ নির্বাচন। 

এ বিষয়ে সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকায় তাদের অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক আমাকে ভালোবাসেন। আশা করছি, বিএনপির অনেকে আমাকে ভোট দেবেন। এ বিষয়ে কামরুল হুদা বলেন, ২০০১ সালের হিসাব এখন চৌদ্দগ্রামে চলবে না। বিএনপি ছাড়া চৌদ্দগ্রামে জামায়াতের অস্তিত্ব কতটুকু, এবারের নির্বাচনে প্রমাণিত হবে। 

এ আসনে জামায়াতের ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, বিএনপির কামরুল হুদা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহিউদ্দিন শহিদ, মুক্তিজোটের মোহাম্মদ ইউসুফ, বাংলাদেশ গণফ্রন্টের আলমগীর হোসেন, স্বতন্ত্র মো. তৌহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ কংগ্রেসের আ ফ ম আবদুর রহিম ও জাতীয় পার্টির মো. মাইন উদ্দিন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।