মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন করেছে তদন্ত কমিটি। বিয়ারিং প্যাডের নিম্নমান, নকশাগত ত্রুটি এবং কারিগরি অদূরদর্শিতাকেই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য মূলত তিনটি বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে : ১. নিম্নমানের উপকরণ : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ল্যাবে বিয়ারিং প্যাডটি পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত প্যাডগুলো প্রচলিত বা নির্ধারিত মানের চেয়ে অনেক নিম্নমানের ছিল। ২. নকশায় ত্রুটি : মেট্রোরেলের মূল নকশায় কিছু বিচ্যুতি ধরা পড়েছে। রেল চলাচলের সময় যে কম্পন তৈরি হয়, ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে সেই কম্পনের মাত্রা অতিরিক্ত ছিল। এই অধিক কম্পনেই প্যাডটি স্থানচ্যুত হয়। ৩. স্থাপনে ত্রুটি : বিয়ারিং প্যাডটি সমান্তরালে না বসিয়ে কিছুটা ঢালু অবস্থায় স্থাপন করা হয়েছিল। ফলে কম্পনের মুখে এটি খুব সহজেই সরে গিয়ে নিচে পড়ে যায়।
উপদেষ্টা জানান, খুলে পড়া দুটি বিয়ারিং প্যাডের ৮ থেকে ১০টি প্যারামিটারের মধ্যে অন্তত দুটি প্যারামিটারের মান আশানুরূপ ছিল না। তবে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে মেট্রোরেলের সব বিয়ারিং প্যাড ভালো বা খারাপ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
ঘটনাটিকে অনেকে নাশকতা হিসেবে ধারণা করলেও উপদেষ্টা তা সরাসরি নাকচ করে দিয়ে জানান, এটি নিছক একটি কারিগরি ও গুণগত মানের অভাবজনিত দুর্ঘটনা। এর পেছনে নাশকতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, সরকার এই তদন্তে পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হয়ে স্বচ্ছতার খাতিরে তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করার পরিকল্পনা করছে।
যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, মেট্রোরেল বন্ধ করে দিতে হবে এমন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বর্তমানে নেই। তবে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য মেট্রোরেলের প্রতিটি বিয়ারিং প্যাড নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মেট্রোরেলের পিলার ও উড়ালসড়কের (ভায়াডাক্টের) সংযোগস্থলে বিয়ারিং প্যাড থাকে। এগুলো রাবার ও স্টিলের মিশ্রণে তৈরি। একেকটির ওজন ৫০ থেকে ৮০ কেজির মতো। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমন ২ হাজার ৪৮০টি বিয়ারিং প্যাড রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথমবার ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও প্রায় ১১ ঘণ্টা মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ছিল। এরপর গত ২৬ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একই এলাকায় আবারও একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে। প্রায় ৮০ কেজি ওজনের ওই প্যাড মাথায় পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয় এবং মেট্রোরেল চলাচল পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সে সময় জানিয়েছিলেন উপদেষ্টা।