শিশুর শারীরিক মানসিক নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কতটা সমৃদ্ধ হবে, তা নির্ভর করে মা-বাবা কীভাবে লালন করছেন তার ওপরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা না জেনে শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ করেন যা সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই শিশুর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা যায়, আর কী আচরণ করা যায় না তা জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। লিখেছেন শ্যামল আতিক
কিছু ভয় শিশুর মধ্যে সহজাত, মোটামুটি সব শিশুর মধ্যেই এগুলো থাকে। যেমন মা-বাবা থেকে আলাদা হওয়ার ভয়, অন্ধকারের ভয়, অপরিচিত কাউকে দেখলে ভয়, বিকট শব্দের প্রতি ভয় ইত্যাদি। এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। নিরাপত্তার প্রয়োজনেই এগুলো শিশুর মধ্যে থাকে। শিশুকে জিন-ভূত-ডাকাত-বাঘের গল্প শুনিয়ে খাওয়ানো বা ঘুম পাড়াবেন না। ক্রমাগত এসব গল্প শুনতে শুনতে শিশুর অবচেতনে ভয়ের ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়।
ভয় দেখানো, ভয়ের গল্প বলা, ভয়ের সিনেমা বা দুর্ঘটনার দৃশ্য এ বিষয়গুলো শিশু মনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মনের অবচেতনে ভয়ের ধারণা বদ্ধমূল হয়। অধিকাংশ শিশু পরিণত বয়সেও তা কাটিয়ে উঠতে পারে না। আশপাশের মানুষের আচরণ দেখেই শিশুর মধ্যে ভয় সঞ্চারিত হয়। তাই কুকুর, তেলাপোকা, টিকটিকি দেখলে ভয়ে দৌড় দেবেন না, শিশুর সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করবেন। আত্মীয়স্বজন অথবা পাড়া প্রতিবেশী কেউ মারা গেলে শিশুর কাছে লুকাবেন না। বরং তাকে বুঝতে দিন জন্ম যেমন স্বাভাবিক, মৃত্যুও স্বাভাবিক।
ভয় পেলে ‘কোনো ভয় নেই, কিছু হয়নি’ ইত্যাদি বলে শিশুর ভয়ের অনুভূতিকে অস্বীকার করবেন না। এর ফলে শিশু মনে করবে তার অনুভূতিকে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন না অথবা অস্বীকার করছেন। ভয়ের স্মৃতি বলতে চাইলে শিশুকে বাধা দেবেন না। ডান মস্তিষ্কে ভয়ের স্মৃতি থাকে। বলতে দিলে, লিখে বা আঁকার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারলে শিশুর বাম মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়। এভাবে মস্তিষ্কের দুই বলয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়ে ভয়ের মাত্রা প্রশমিত হয়।
শিশু যদি বলে বিছানার নিচে ভূত আছে, আপনার কাজ হলো সুযোগ বুঝে বিছানার নিচের অংশ দেখিয়ে দেওয়া। কয়েকদিন এভাবে দেখালে, এ ধরনের ভয় এমনিতেই কেটে যাবে। শিশুর যদি উচ্চতা ভীতি থাকে, তাকে জানান যে এটা স্বাভাবিক। ছোটবেলায় আপনাদেরও এমন ভয় ছিল, এখন এ ধরনের ভয় লাগে না। ভয় প্রশমনে খেলাধুলা একটি কার্যকরী পন্থা। তাই সুযোগ পেলেই শিশুকে খেলার সুযোগ করে দিন। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি খোলা মাঠে দৌড়াদৌড়ি করতে দেন।
কোনো দুর্ঘটনা বা ব্যর্থতায় বা সহিংসতায় শিশু যদি বিপর্যস্ত হয়ে যায়, আপনার প্রথম কাজ হচ্ছে শিশুর পাশে দাঁড়ানো, তাকে ধরে থাকা। কী হয়েছে? কান্না করছো কেন? আমাকে বলো এ ধরনের কথা শিশুকে বলবেন না। শিশুকে যে কোনো শখ লালন করতে উৎসাহিত করুন। এটা হতে পারে বাগান করা, বই পড়া, কয়েন সংগ্রহ অথবা সৃজনশীল কোনো কাজ। আসলে মনোরাজ্যে আলাদা জগৎ তৈরি করতে পারলে শিশু অনেক নেতিবাচক আবেগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে।